সৎমা কোনো নির্দিষ্ট শব্দ নয়

এই লেখাটা সবাই পড়বেন অবশ্যই।
সত্যি খুব ভালো লাগলো, আপনারও ভালো লাগবে আশা করি।
Mom - Baby Lovly Pic - Valobasa.com
ঘরের একটা কোনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে রোহিনী।
বছর সাতের রোহিনী ,ভয়ে জড়োসড়ো, একটা নতুন অপরিচিত মানুষ হঠাৎ তাদের বাড়িতে এসে ঢুকলো।
রোহিনীর বাবার নতুন বউ। রাঙা দিদা বলেছে ,নতুন মা বলতে।
রোহিনী বলেছিলো, আন্টি বললে হয় না?
মায়ের ছবিটা চোখের সামনে এখনো ভাসছে। 
মাত্র বছর খানেক হলো কিডনি অকেজো হয়ে মা চলে গেলো রোহিনীকে ছেড়ে।
রোহিনী তো ভীষণ শান্ত তবুও যে কেন বাবা রোহিনীকে সামলাতে পারছে না বলে একটা নতুন মা নিয়ে এলো কে জানে!! 
এই মায়ের নাম নাকি নিবেদিতা। বেশ মিষ্টি মিষ্টি দেখতে ,ফর্সা ,রোহিনীর মত কালো নয়। 
রোহিনীকে নাকি আর বাবা ভালোবাসবে না, নতুন মাকে নাকি সৎ মা বলে, সে তো রোহিনীকে খেতেও দেবে না। পাশের বাড়ির আন্টিরা বলেছে। ভীষণ ভয় করছে রোহিনীর।

সোফায় বসেই নতুন মা রোহিনীকে ডাকলো, রোহিনী জড়সড় হয়ে গিয়ে বলল, আমি তোমাকে আমার সব টেডি দিয়ে দেব, প্লিজ আমাকে মেরো না। 
নতুন মা বললেন, ওসব কথা পরে হবে এখন তুমি আমাকে কি বলে ডাকবে বলো তো?
রোহিনী বললো, আন্টি বলবো না, নতুন মা বলবো,তাহলে...
কথা শেষ না হতে দিয়েই উনি রোহিনীকে কোলের কাছে বসিয়ে বললেন, ঐ যে ছবিটা দেখছো ওটা তোমার মা। 
আমি তোমার একটা বন্ধু। তুমি আমাকে নিনি ডেকো, ওটা আমার ডাকনাম।
আরেকটা কথা আমি ঐ তুলোর কথা না বলা টেডি পছন্দ করি না, আমার এইরকম চোখ নাক নড়ছে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা টেডিই পছন্দ, আমার এটাকে চাই। বলেই রোহিনীর গলায় কাতুকুতু দিতে লাগলো।

তারমানে বাবা রোহিনী একা থাকে বলে রোহিনীর জন্য একটা বন্ধু এনেছে, সৎ মা নয়...
বন্ধ নিঃশ্বাসটা একটু একটু করে বেরিয়ে গেলো রোহিনীর। 
নিনি বেশ ম্যাজিক জানে....দশ মিনিটের মধ্যেই ওর পছন্দের এগ টোস্ট বানিয়ে দিলো। রাত্রিবেলা রোহিনী ভয় পাবে বলে নিনি রোহিনীর পাশেই ঘুমোতো।
যেদিন স্কুলের স্পোর্টসে রোহিনী হেরে গিয়েছিলো, খুব কাঁদছিলো, সেদিন ওর নিজের সেই চুলে ঝোটকন বাঁধা ছবিটা দেওয়া একটা কফি মগ  নিনি ওকে প্রাইজ দিয়েছিলো। বলেছিলো, হেরে যাওয়া আছে  বলেই না জয়ের আনন্দ আছে। তাই হেরে যাওয়াকেও সেলিব্রেট করো। 
Mom Dressing Her Baby - Valobasa.com


তারপর কবে যেন রোহিনী বড় হয়ে গেছে, কিন্তু নিনি কোনোদিন মা হয়নি। রোহিনী এখন কলেজের স্টুডেন্ট, নিনির সাথে একই বিছানায় শোয় না। নিনিও বাবার ঘরে ঘুমায় না, ও বাবার স্টাডির ছোট্ট ডিভানে ঘুমোয়।

মাঝে মাঝে নিনিকে মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে রোহিনীর কিন্তু এতো বছরের অনভ্যাসে, সংকোচ কাটিয়ে ডাকা হয়ে ওঠেনি।
রোহিনীর খুব ইচ্ছে ফিল্ম মেকিং নিয়ে পড়ার, পুনেতে গিয়ে থাকতে হবে শুনেই রোহিনীর বাবা এক বাক্যে না করে দিয়েছে। এখন একমাত্র ভরসা নিনি। 
রোহিনী অপেক্ষা করছিল নিনির ঘরে, নিনি বোধহয় বাথরুমে ঢুকেছে।  ভিজে কাপড়েই নিনি ঘরে ঢুকলো। রোহিনী অবাক হয়ে দেখছিল, দুধে আলতা গায়ের রঙে আকাশনীল ভিজে কাপড়টা কি অদ্ভুত ভাবে নিনির শরীরের মধ্য যৌবন ফুটিয়ে তুলেছে। 
হঠাৎ রোহিনীর মনে একটা প্রশ্ন জাগলো! আচ্ছা নিনি আর বাবাকে তো কোনোদিন কোনো অন্তরঙ্গ মুহূর্তে দেখেনি  সেই ছোট্ট থেকে।রোহিনীর ছোট বেলায় নিনি ঘুমোতো ওর ঘরে এখন বাবার স্টাডিতে।বাকি সময় হয় রান্না ঘর নয় ডাইনিংয়ের টিভির সামনে তাহলে নিনির সাথে কি বাবার কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নেই?

নিনির আদরের মধ্যেও এমন একটা গাম্ভীর্য আছে যেটার জন্য রোহিনী কিছুতেই প্রশ্নটা করে উঠতে পারে না।

নিনি রোহিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মনের ভিতরের কথাটা মনে চেপে না রেখে বলে ফেলাই উচিত। রোহিনী লজ্জা পেয়ে বললো, আমি পুনেতে গিয়ে পড়তে চাই বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব তোমার। 

নিনি যেন চমকে উঠলো, অথচ এর আগে রোহিনীর খেলনার বায়না, চকলেটের বায়না, পোশাকের বায়না  সবই তো বাবাকে বলে নিনিই সামলেছে, আজ কেন নিনি এতটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো?

রোহিনীর মাথায় আস্তে আস্তে সেই ছোটবেলার মতো হাত বোলাতে বোলাতে নিনি বললো, রোহিনী আমার বোধহয় এতটা অধিকার নেই। তুমি ফিল্ম মেকিং নিয়ে ডিগ্রি কোর্স করার জন্য পুনে যেতে চাও সেটাতে তো তোমার বাবার আপত্তি আছে। অন্য মায়ের মতো সন্তানের ওপর অধিকার তো আমার নেই তাই, রোহিনী অবাক হয়ে দেখছে অন্য এক নিনিকে। যে খুব কষ্ট করে কান্নাগুলোকে গলার মধ্যে গিলে নিচ্ছে। রোহিনী ,তুমি বড় হয়েছ সত্যিটা জানানোর সময় এবার এসেছে ....।
আমি ছিলাম তোমার বাবার অফিসের পি.এ। আমার সৎ মা আমাকে একটা খারাপ পাড়ায় বিক্রি করে দিচ্ছিল, সেই অবস্থায় আমি খুব বিপদে পড়ে তোমার বাবার কাছে সাহায্য চাই। উনি তোমার দেখাশোনার জন্য গভর্নেস হিসেবে আমাকে নিযুক্ত করেন কিন্তু আমরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করি শুধু সমাজের ভয়ে। এক বাড়িতে থাকবো কোনো পরিচয় ছাড়াই তা হয়না। 
রোহিনীর এই প্রথম মনে হলো নিনি নয়, নতুন মা নয়, শুধু মা বলে ডাকা উচিত নিনিকে। 
রোহিনী গলাটা জড়িয়ে ধরে মা বলে ডেকে উঠলো নিবেদিতাকে। 
নিবেদিতা যেন সর্বস্ব দিয়ে আগলে ধরলো রোহিনীকে। 

মায়ের ছোঁয়ায় কোথাও সৎ মায়ের স্পর্শ ছিল না। সেই তেরো বছর  আগের এক রাতের কথা মনে পড়ে গেলো রোহিনীর....।

জ্বরে রোহিনীর গা পুড়ে যাচ্ছে। চোখ মেলে দেখলো একটা ঠান্ডা হাত ওর কপালে, আর দুটো রক্তিম নির্ঘুম চোখ ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। 

সেদিনও নিনির ছোঁয়াটা ঠিক আজকের মতোই ছিল তারমানে এই তেরো বছরে রোহিনী বদলেছে কিন্তু নিনি বদলায়নি একটুও। তারমানে সত্যিই সৎ মা বলে নির্দিষ্ট কোনো শব্দ হয় না। ভালোবাসা থাকলে মা হয়ে উঠতে দেরি হয়না। আর বন্ধনহীন সম্পর্ক যতই নাড়ি ছেড়া হোক সেটা দূরে যেতেও সময় লাগে না। 
Mom and Baby Playing - Valobasa.com
রোহিনীর বাবা রাধাকান্ত সরকার আজ একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে এসে দেখলেন, নিবেদিতার কোলে রোহিনী শুয়ে আছে আর নিবেদিতা ওর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। ওকে দেখেও মা মেয়ের কারোর নিজেদের সুখানুভুতি থেকে  একটুও সরতে ইচ্ছে করছে না সেটা ওদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে। রাধাকান্তর সত্যিই মাঝে মাঝে অবাক লাগে নিবেদিতাকে দেখে, সেই যে কথা দিয়েছিলো শুধুই রোহিনীর মা হবার চেষ্টা করবে বাড়ির গৃহিণী নয়, সে কথার মর্যাদা ও রেখেছে। 

রোহিনী ডেকে উঠলো,বাবা! 
আমার একটা অনুরোধ তোমায় রাখতে হবে। আজ থেকে তোমার বেডরুমটা মায়ের হবে, মা আর স্টাডিতে শোবে না। 
নিবেদিতা রোহিনীর মুখে হাত চাপা দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করছে। রাধাকান্ত অবাক!!
রোহিনী কোনোদিন ওর সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলেনি, আজ হঠাৎ কি হলো?
রাধাকান্ত বললো, আমি তোমার মাকে বলিনি কোনোদিন আমার ঘরে ঢোকা তার বারণ আছে। সে যেকোনো সময় এই বাড়ির যেকোনো ঘরে যেতেই পারে, তার সে অধিকার আছে। 

নিবেদিতা আবার মনে মনে প্রণাম করলো ভগবানের মত মানুষটাকে।মারা যাবার আগে নিশ্চয় স্ত্রীর পরিচয়ে তার বুকে একবার মাথা রাখবেই নিবেদিতা।

রোহিনীর পাগলামি মাত্রা ছাড়িয়েছে। নিবেদিতার কোনো কথাই সে শুনছে না আজ, কিছু বারণ করতে গেলেই বলছে তাহলে কিন্তু জলে ভিজে ঠান্ডা লাগবো। রোহিনীর জলে ভিজলেই জ্বর আসে নিবেদিতা তাই ওই ব্যাপারে খুব সাবধানে রেখেছে মেয়েকে। 
গতকাল থেকে আর একবারও রোহিনী নিনি বলে ডাকেনি।
কারণে অকারণে মা বলে ডেকে চলেছে। ভালোলাগায় শিউরে উঠেছে নিবেদিতা কিন্তু রোহিনী এখন যেটা শুরু করেছে সেটা তো মানা যায় না!!
Maa R Meyer Bhalobasa

নিবেদিতার সমস্ত শাড়ি, জিনিসপত্র সব এনে বাবার আলমারিতে বাবার জামা কাপড়ের পাশে সাজিয়ে রাখছে। 
লজ্জায় মরে যাচ্ছে নিবেদিতা। রাধাকান্ত বাবু মেয়ের কান্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসছেন।

রাতে জোর করে নিবেদিতাকে বাবার ঘরে পাঠিয়ে দিলো রোহিনী।
ওর চোখে মুখে যেন বিশ্ব জয়ের হাসি। 
নিবেদিতা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকছে। ৪১ বছরের নিবেদিতা যেন নববধূ এতটা সংকোচে সে আর কখনো পড়েনি।
রাধাকান্ত বাবু হাত ধরে নিবেদিতাকে পাশে বসালেন, ধীরে ধীরে বললেন, একটা জীবন চালানোর জন্য স্ত্রীর থেকেও বেশি দরকার হয় একজন বন্ধুর। যে মনের কাছাকাছি থাকবে, যার সাথে সুখ দুঃখের সব কথা প্রাণ খুলে বলা যাবে, কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে যেগুলোর হয়তো সঠিক নাম নেই কিন্তু সে না হলে সব অকেজো হয়ে যায় নিমেষে, তুমিও ঠিক তেমনই আমার কাছে। নিবেদিতা চলো আমরা বন্ধু হই আজ থেকে। 

নিবেদিতা নীরবে নিজের হাতটা রাধাকান্ত বাবুর হাতের উপর আলতো করে দিয়ে নিজের সম্মতি জানালো। 
 - অর্পিতা সরকার

0 comments:

Post a Comment