একা না দোকা

"আর আমি একা পারছিনা দীপ, এবার বিয়েটা কর। বয়স তো অনেক হল। তোর বয়সী সবাই বিয়ে করে বাবা হয়ে গেছে। অফিসে যাদের সাথে থাকিস তারাও তোর থেকে ছোট হয়ে বৌ বাচ্চা নিয়ে সংসার করছে।"

"উফ্, মা সব সময় বিয়ে বিয়ে কোরো না তো। বিয়ে মানেই তো স্বাধীনতা শেষ। খালি দোকান, বাজার আর কুলিগিরি করা। তার থেকে এই ভালো আছি।"

"৩৯ বছর বয়স হল তোর। সেটা খেয়াল আছে? আমি আর কত দিন!"

"বাজে কথা না বলে যাও টিভি দেখ।"

 রাতে ব্যাগ গুছিয়ে শুতে বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেছে দীপের। কাল অফিসের বন্ধুদের সাথে পুরী ঘুরতে যাবে। বন্ধু না বলে ভাই বললেই ভালো হয়। সবাই ওর থেকে বয়সে অনেকটাই ছোট। কিন্তু একসাথে চাকরি করে বলে বন্ধু বলেই পরিচয় দেয়। ওরাও দাদা না বলে নাম ধরেই ডাকে। ইয়ার্কি, ফাজলামো বন্ধুদের মতোই হয়।

 তিনদিনের ট্যুর। জিনিস খুবই কম। তবু নিজে গোছাতে একটু সময় লেগে গেল। মাকে বলতে পারত। কিন্তু তাতে ওখানে গিয়ে অসুবিধেতে পড়তে হত। কি দিতে কি ভুলে যেত তার ঠিক নেই। আসলে অফিস থেকে ফিরে রোজ একটু ক্লাবে যায় ক্যরাম খেলতে। আজও গেছিল। তাই একটু দেরি হল।

কথা মতো রাত ন'টার ভিতরে দীপ স্টেশনে পৌঁছে গেছে, ১০.৪০ এ ট্রেন। কিন্তু জয় ছেড়ে আর কেউ এখনো পৌঁছায়নি। পুরো টিমের ভিতরে একমাত্র সে আর জয় অবিবাহিত। বাকি সুজয়, বিপিন, অনুপম, জয়ন্ত এরা সবাই বিবাহিত। বিপিনের তো একটা তিন বছরের ছেলেও আছে। ওরা সবাই বৌ বাচ্চা নিয়েই যাচ্ছে। ওদের সবার দেরি হচ্ছে দেখে দীপ বলল,

"দেখেছিস, এই জন্য বিয়ে করতে চাই না। একা থাকার কি সুখ তা মানুষ বিয়ের পর বোঝে। আর আমি আমার বিবাহিত বন্ধুদের দেখেই বুঝেছি। তাই ওই ভুল আর করছি না।"

কথা শেষ হতেই পিছনে তাকিয়ে দেখে বিপিন আসছে। দু'হাতে দু'টো বিশাল বড় বড় ব্যাগ নিয়ে ভালো করে হাঁটতে পারছে না। বৌ কাঁধে ব্যাগ আর হাতে ছেলেকে ধরে ওর পিছনে পিছনে আসছে। জয় তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ধরল ওর একটা ব্যাগ। কাছে আসতেই দীপ বলল,

"তিন দিন ঘুরতে এতো কি নিয়েছিস? আমার তো এই ছোট্ট একটা ব্যাগেই সব ধরে গেছে।"

"তুই আর আমি কি এক হলাম! তুই একা, আর আমরা তিন জন। তার উপর ছেলেটা ছোট। ওর কত কি লাগে।"

একে একে সুজয়, অনুপম আর জয়ন্ত চলে এলো। ওদেরও বড় বড় দু'টো করে ব্যাগ হয়েছে। জয় বলল,

"হ্যাঁ রে, বিপিনের না হয় ছেলের জন্য এতো গুলো ব্যাগ। তা তোদের এতো বড় ব্যাগ হল কেন?"

অনুপম হেসে বলল,

"আর বলিস না ভাই! বৌ বলে তিন দিনে ছ'টা জামা পরবে। তার পর একটা পরে স্নান করবে, একটা পরে ঘুমাবে। উফ্ বৌ থাকা যে কি ঝক্কি বুঝবি না ভাই। তোরাই ভালো আছিস।"

"আচ্ছা, নিজের বুঝি কিছু নাওনি! যত দোষ আমার! এবার যখন বেড়াতে যাব তখন তোমার কিছু নেব না। দেখবে ব্যাগ একটা কমে যাবে।"

অনুপমের বউয়ের কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

ট্রেনে উঠে গল্প করতে করতে যে যার বিছানা করছে। বৌ'রা একটা সিটে বসে গল্প করছে। বিছানা হয়ে গেলে যে যার শুয়ে পড়ল। ওদের দেখে অবাক লাগছে দীপের। বর গুলো কেমন বিছানা করে দিল, আর বৌ গুলো কি সুন্দর গিয়ে শুয়ে পড়ল। এই জন্যই বিয়ে করতে ইচ্ছা হয় না ওর। ছেলেরা বিয়ের পর কেমন গোলাম টাইপের হয়ে যায়। একবার এটা গুছায়, একবার ওটা গুছায়। ব্যাগ থেকে বৌ কে জিনিস খুঁজে দেয়। ঘুরতে গিয়ে পুরো কুলি হয়ে যায়। দেখে দেখে অসহ্য লাগে ওর।

দীপের খুব ইচ্ছা ছিল ওখানে দু'টো ঘর নেওয়ার। একটাতে ছেলেরা আর একটাতে মেয়েরা থাকবে। কিন্তু বিপিন রাজি হল না। ছেলেটা রাতে অনেক বার ওঠে। তাই বৌ একা সামলাতে পারবে না। অনুপম আর জয়ন্ত ও রাজি নয়। পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে পরিবারকে আলাদা রাখার পক্ষপাতি তারা নয়। অগত্যা সে আর জয় একটা ঘর নিল, আর বাকিরা আলাদা আলাদা ঘর নিল। 

দুপুরে সমুদ্র স্নান সেরে ছেলেরা আড্ডা দিতে বসলে মেয়েরা বেড়িয়ে পড়ল কেনাকাটা করতে। এই সুযোগে দীপ বাকিদের জিজ্ঞাসা করল,

"হ্যাঁ রে, তোরা বৌ বাচ্চা নিয়ে বোর হোস না? রাত জেগে বাচ্চা সামলাস, বিছানা করিস, কুলি গিরি করিস, বিরক্ত লাগেনা তোদের?"

বিপিন হেসে বলল,

"অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর ছেলে যখন বাবা বলে গলা জড়িয়ে ধরে তখন নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ মনে হয়। বৌ সারাদিন ওই বাচ্চার সব ঝামেলা সামলায়। তার উপর সংসারের চাপ। রাতে ওকে একটু বিশ্রাম দিই। মেয়ে হলেও মানুষ তো।"

অনুপম বলল,

"সারা বছর সংসারে কুলি গিরি করছে বৌ গুলো। এক দিন বাড়ি থাকলে বুঝবি ওদের কি জ্বালা। আমার বৌ তো অফিস যায় রান্না করে, আবার ফিরেই রান্না ঘরে ঢোকে। মা বাবার কখন কি প্রয়োজন আমার থেকে ওই ভালো জানে। তাই বিছানাটা রোজ আমিই করি। এটুকু করলে নিজে শান্তি পাই। কিছু তো একটা করলাম। আসলে কি জানিস ভাই, দু'জন দু'জন কে না বুঝলে সংসার হয় না। ওরা সব ছেড়ে এসেছে আমাদের কাছে। ওদেরও তো কিছু চাহিদা, ইচ্ছা, শখ থাকে। সব পূরণ করতে না পারি যে টুকু পারি তাই শান্তি।"

"আচ্ছা অনুপম আগে তো বলতিস রোজ সন্ধ্যেবেলা ক্লাবে যাস। বিয়ের পর নিশ্চয়ই আর যাস না। গেলে বৌ রাগ করবে। তা বৌদের এই অন্যায় আবদার গুলো মানতে ভালো লাগে?"

"তোর প্রশ্নের উত্তর পরে দিচ্ছি দীপ। আগে আমার একটা কথার উত্তর দে। রোজ যদি বাড়ি ফিরে দেখিস তোর মা পাশের বাড়ির কারুর সাথে গল্প করতে গেছে, তুই ফেরার পরেও মা ফিরছেন না। রাত ১০ টায় এসে খালি খেতে দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন। কেমন লাগবে তোর? নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না। বাড়ির বৌদের তাহলে কি করে প্রতি দিন সন্ধ্যে বেলা একা থাকতে ভালো লাগবে? ওরাও তো সারাদিন পর আমাদের সাথে একটু সময় কাটাতে চায়। তবে মাঝে মাঝেই যাই ক্লাবে। তখন বৌ রাগ করে না। আসলে সবার দিকটা ভাবতে হয়।"

এই তিন দিনের ঘোরাতে অনেক কিছু শিখল দীপ। স্বামী স্ত্রী যে কোনো ভালো জিনিস কেমন ভাগ করে খায়। ভিড়ের মধ্যে কেমন সামলে রাখে একে অপরকে। একজনের মনের ইচ্ছা কি অদ্ভুত ভাবে আর একজন বুঝতে পারে। সত্যি কি অসাধারন একটা সম্পর্ক যেখানে দুঃখ, রাগ, ভালোবাসা, মান-অভিমান সব আছে শুধু সে গুলোকে দুটো মানুষ মিলে মিশে ভাগ করে নিতে জানতে হয়।

ট্রেনে কলকাতা ফেরার সময় দীপ দেখল বৌ গুলো সব কেনাকাটার লিস্ট খুলে বসেছে। বাড়ির সবার জন্য কিছু না কিছু কিনেছে। আর তাই দেখে ছেলে গুলো সমানে কৃত্রিম সুরে ঠাট্টা করে যাচ্ছে। সত্যি ওদের ভিতরের হাসি ঠাট্টা, ভালোবাসা আজ বিয়ে সম্পর্কে দীপের ধারণা বদলে দিয়েছে অনেকটা। কেমন যেন তার মনে হচ্ছে জীবনের অনেক বড় একটা অধ্যায় ওর অজানা রয়ে গেছে। ওই অজানা অধ্যায়টা জানার জন্য আজ মনটা কেমন উতলা হচ্ছে। না এবার মা বললে আর না করবে না সে। কিছু ঝক্কি পোহাতে মনে হয় ভালই লাগে।

- অতসী দাস

মিষ্টি সম্পর্ক

 গল্প : মিষ্টি সম্পর্ক

নীরা নতুন অফিসে জয়েন করতে, বস মিস্টার সেন নীরাকে নিয়ে একটা রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন, “একটা নতুন প্রোজেক্ট শুরু হচ্ছে, আপনি ওতে যোগ দিন। ওদের একজন প্রোগ্রামার লাগবে।”

রুমে ঢুকে নীরা দেখল সেখানে ছজন বসে আলোচনা করছিল। সবাইকে সম্বোধন করে মিস্টার সেন বললেন, “উনি আপনাদের প্রোজেক্টে প্রোগ্রামার হিসেবে যোগ দেবেন। ওনার নাম নীরা চ্যাটার্জি।” ওই গ্রুপে মাঝে বসা নীল রঙের জামা পরা ভদ্রলোকটাকে দেখিয়ে নীরাকে মিস্টার সেন বললেন, “উনি হচ্ছেন প্রোজেক্ট ম্যানেজার কৌশিক ব্যানার্জি, ওনার আন্ডারে আপনি কাজ করবেন।”

নীল জামা পড়া লোকটা মানে কৌশিক একটু বিস্ময়ের সাথে দাঁড়িয়ে পড়ল। অবাক চোখে নীরার দিকে তাকিয়ে থাকল। মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারল এই ভাবে তাকানো অশোভনীয়, তাই সাথে সাথে হ্যান্ড শেক করার জন্য হাত বাড়াল। কৌশিককে দেখেই নীরা কি রকম থতমত খেয়ে গেল। ইচ্ছে করছিল ঘর থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যেতে, কিন্তু এতো ভালো চাকরি ছাড়বে কি করে? আগের চাকরিটা হারিয়ে ফেলেছে। কৌশিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। নিরুপায় হয়ে আমতা আমতা করে নীরাও হাত বাড়াল।

মিস্টার সেন বাকি পাঁচজনের সাথেও পরিচয় করালেন, চারজন ছেলে রিজু, মির, রাকিব আর সোহাম আর একজন মেয়ে তিস্তা। নীরা বাকিদের সাথেও হাত মেলালো। কৌশিক ওকে একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, “বসুন”। নীরা যন্ত্রচালিতের মত সামনের চেয়ারে বসল। কিন্তু মাথা কাজ করছে না। মিস্টার সেন বললেন, “আপনারা কাজ করুন আমি যাই।”

নীরার খুব ইচ্ছে করছিল মিস্টার সেনকে বলতে অন্য প্রোজেক্টে যোগ দিতে চায়। নতুন জায়গায় কি করে বলবে? মনে মনে ভাবল, ছাড়তে তো যেকোনো দিন পারবে। চাকরি করতে বেরোলে এতো সব ভাবলে চলবে না। সাথে কে কাজ করছে দেখলে চলবে না। নিজের কাজ করে বেরিয়ে যেতে হবে।

বাকিরা আলোচনা করে যাচ্ছে, ও শোনার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুই মাথায় নিতে পারছে না। বারে বারে চোখ ঘড়ির দিকে যাচ্ছিল, কতক্ষণে মুক্তি পাবে এখান থেকে। নীরার অস্বস্তি হচ্ছে বুঝে কৌশিক দু একবার নীরার দিকে তাকাল, কিন্তু নীরা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল। বিকেল সাতটা নাগাদ কৌশিক বলল, “আজ ওঠা যাক। কাল বাকিটা ডিসকাস করে নেব। মিস চ্যাটার্জি আমি কিছু পেপার দিচ্ছি, বাড়ি গিয়ে পড়ে নেবেন। আমাদের প্রোজেক্টের সম্বন্ধে আপনার কিছুটা আইডিয়া হয়ে যাবে।”

সবাই উঠে পড়ল রুম থেকে বেরোবার জন্য। কৌশিক নীরার দিকে তাকিয়ে বলল, “এক মিনিট অপেক্ষা  করবেন আপনি। আমি কাগজগুলো আলমারি থেকে বের করে দিচ্ছি।”

নীরা ঠিক এই মুহূর্তটা এভয়েড করতে চায়ছিল। কিন্তু এখন কি করবে? মাথায় কিছু আসছে না? বাকিরা সবাই বেরিয় যাচ্ছে। সহকর্মী মহিলাটির নাম কিছুতেই মনে পড়ছে না। কোন রকম বলল, “হ্যালো ম্যাম!”

তিস্তা হ্যালো ম্যাম শুনে ঘুরে তাকাল। নীরা বলল, “আপনার সাথে একটু দরকার ছিল।”

তিস্তা একবার কৌশিকের দিকে তাকাল। কৌশিক নীরার দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করল, তারপর তিস্তাকে বলল, “আপনিও বসুন।”

কৌশিক আলমারি থেকে কিছু কাগজ বার করে দিতেই নীরা সেগুলো নিয়ে কোন রকম ব্যাগে ঢুকিয়ে তিস্তার সাথে বাইরে বেরিয়ে গেল। তিস্তার নীরার এই ব্যবহার একটু অস্বভাবিক মনে হচ্ছিল। তাছাড়া নীরার কপালে ঘাম দেখে সামথিং ইজ রং মনে হচ্ছিল। তাই নীরাকে বলল, “আপনার শরীর ঠিক আছে? এত ঠাণ্ডাতেও কি রকম ঘেমে গেছেন।”

নীরা আমতা আমতা করে বলল, “না আসলে সারাদিন খুব ধকল গেছে। দুর্গাপুর থেকে আজকেই এসেছি। কোন ভোরে উঠেছি তাই একটু ক্লান্তি লাগছে।”

তিস্তা বলল, “আপনি কোলকাতায় থাকেন না?”

নীরা, “না আমি এখানে থাকি না। আগের চাকরি খড়গপুরে ছিল। সেখানে একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। গত মাসে কোম্পানিটা উঠে গেছে।”

তিস্তা, “আজ কোথায় থাকবেন?”

নীরা বলল, “আজ লাবনির কাছে একটা গেস্ট হাউস বুক করেছি। দু একদিনের মধ্যে একটা ভাড়া বাড়ি খুঁজে শিফট হয়ে যাব।”   

 নীরা তিস্তার সাথে ভালো বন্ধুত্ব তৈরি করে নিল। এক সাথে অফিস থেকে বেরোতো। টিফিন এক সাথে খেতো। যেকোনো প্রকার কৌশিকের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করত। কৌশিক দু একবার চেষ্টা করেছিল নীরার সাথে একা কথা বোলার, কিন্তু যখন বুঝল নীরা ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে সেও আর নীরার সাথে একটা দুরত্ব বোজায় রাখা শুরু করল।

নীরা তিস্তার সহযোগিতায় ওর বাড়ির কাছে সল্টলেকে একটা ভাড়ায় ফ্ল্যাট জোগাড় করে শিফট হয়ে গেল। পাশাপাশি থাকার ফলে দুজনের মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। নীরা তিস্তার সাথে অফিসে আসা আর যাওয়া শুরু করল, তাতে কৌশিককে এড়িয়ে যাওয়া খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল। 

নীরা খড়গপুর থেকে ইন্ডাকশন আর বাসনগুলো নিয়ে চলে এসেছিল। মাঝে মাঝে নিজে রান্না করতো আবার কখনও হোম ডেলিভারি থেকে আনিয়ে নিত। মাঝে মাঝে তিস্তাও নীরাকে নিজের বাড়ি ডিনারের জন্য ডেকে নিত। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। ঠিক এমন সময় একদিন রাত একটায় নীরার ফোন বেজে উঠল। এতো রাতে কে আবার ফোন করল? ঘুমের মধ্যে ফোনটা ধরল। ওপার থেকে ভীত মায়ের আওয়াজ এল, “নীরা বাবার বুকে ব্যাথা করছে। কি করি এত রাতে?”

বাবার বুকে ব্যাথা শুনেই নীরার মাথা ঘুরতে লাগল। এত  দূর থেকে দুর্গাপুরে কি করে সাহায্য করবে? মা একা কি করবে? কার সাথে যোগাযোগ করা যাবে? ওর সব বন্ধুরা তো বাইরে থাকে। আত্মীয়রাও কেউ দুর্গাপুরে থাকে না। তিস্তাকে ফোন করে কোন লাভ নেই। নিরুপায় হয়ে কৌশিককে ফোন করল। কৌশিক এতো রাতে নীরার ফোন দেখে একটু চমকে গেল। ফোন ধরে জিজ্ঞেস করল, “কি হল? এতো রাতে ফোন করলে?”

নীরা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “মা একটু আগে ফোন করেছিল, বাবার নাকি বুকে ব্যাথা উঠেছে। মা একা আছে বাড়িতে। কি করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।”

কৌশিক একটু ভেবে বলল, “দেখি কি করতে পারি।”

কৌশিক ফোন রেখে দিল। কিন্তু নীরার অস্বস্তি বেড়েই চলল। কি করবে বুঝতে পারছে না। ইচ্ছে করছিল ছুটে বাবা মায়ের কাছে চলে যায়। কিন্তু এতো রাতে সেটা কি করে সম্ভব?

দশ মিনিটের মধ্যে কৌশিক আবার ফোন করে বলল, “মাকে বলো একটু টাকা নিয়ে তৈরি হয়ে থাকতে। পনেরো মিনিটের মধ্যে এ্যাম্বুলেন্স চলে আসবে। নার্সিং হোমের সাথেও যোগাযোগ করেছি। নার্সিংহোমের টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না। সেটা আমি পাঠিয়ে দেব। তুমি তৈরি হয়ে থাকো দুর্গাপুর যাওয়ার জন্য, আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে আসছি।”

নীরা মাকে ফোন করে জানিয়ে দিল খবরটা। এত সহজে সমস্যার সমাধান হবে ভাবতেও পারেনি। আশায় করেনি বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছেও এতো তাড়াতাড়ি পূর্ণ হয়ে যাবে। ভেবেছিল সকালের আগে বাড়ির জন্য বেরোতে পারবে না। তাড়াতাড়ি আলমারির সামনে পড়া কিছু জামা কাপড় ব্যাগে ভরে নিল। সামনে হ্যাঙ্গারে টাঙ্গানো জিন্স আর টি শার্ট পরে নিজেও তৈরি হয়ে গেল। 

মায়ের কাছে থেকে খবর পেল বাবাকে আই সি ইউতে ভর্তি করা হয়েছে। ডাক্তাররা দেখছে। মায়ের কথা শুনে নীরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করল। আধ ঘণ্টার মধ্যে কৌশিক গাড়ি নিয়ে চলে এল। নীরা বেরিয়ে পড়ল কৌশিকের সাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে। গাড়ি ছুটে চলল দুর্গাপুরের দিকে। বড় রাস্তা ছোটো রাস্তা, হাইওয়ে ধরে ছুটছে গাড়ি। নীরার মনটাও ছুটছে নিজের অতীত জীবনের অলিগলি দিয়ে।

নীরা আর কৌশিক দুজনে দুর্গাপুরের এন আই টি থেকে সি এস সি নিয়ে বিটেক পাস করেছিল। তারা ব্যাচমেট ছিল। নীরা নবীনবরনের দিন কৌশিকের আবৃতি শুনে ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। কৌশিকেরও নীরাকে বেশ ভালো লেগেছিল। দিনে দিনে ওদের বন্ধুত্ব প্রগাড় হয়ে ভালোবাসায় পরিণত হয়ে গেল।

নীরা দুর্গাপুরের মেয়ে ছিল তাই বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করত। কৌশিক ধানবাদের ছেলে ছিল তাই হোস্টেলে থাকত। প্রায় দিন নীরা কৌশিককে বাড়িতে ডেকে নিয়ে মায়ের হাতের রান্না খাওয়াত। কৌশিকেরও নীরার মায়ের হাতের রান্না খুব পছন্দ ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চারটে বছর ওরা চুটিয়ে প্রেম করেছিল। ক্লাস শেষ হতে দুজনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাঠে বসে গল্প করত। দুজন পড়াও এক সাথে তৈরি করে নিত। প্রতি রবিবার এক সাথে সিনেমা দেখতে যেত। কলেজে ওদের জুটির নাম রোমিও আর জুলিয়েট পড়ে গিয়েছিল। 

 বিটেক পাস করে দুজনই একই কোম্পানিতে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল। ওদের বাড়ি থেকে এই সম্পর্কে কারও আপত্তি ছিল না। দুজন কোলকাতা শহরে আলাদা আলাদা থাকছিল। বিয়ে যখন ওরা একে অপরকেই করবে তো অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না, তাই দুই বাড়ির লোক মিলে ওদের চার হাত এক করে দিল। হানিমুনে সিঙ্গাপুর ঘুরতে গেল। বিয়ের প্রথম ক মাস বেশ আনন্দেই কাটল। কিন্তু বিয়ের যত দিন গড়াচ্ছে, একের পর এক সমস্যা আসতে লাগল। দুজনের অফিস টাইমের কোন ঠিক ঠিকানা ছিল না, কাজের লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। বাড়ির কাজ নিয়ে সমস্যা হতে লাগল। দুজনই নিজের মা বাবার এক মাত্র সন্তান, খুব আদরে বড় হয়েছিল। বাড়ির কোন কাজ শেখেনি। বাড়িতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে কৌশিক আশা করে নীরা রান্না করবে, কিন্তু নীরা ভাবে সেও তো একই রকম পরিশ্রম করে এসেছে, সেই বা রান্না করবে কেন? ঘর মুছবে কেন? বাসন মাজবে কেন? 

বাড়িতে আত্মীয় এলে কৌশিক আশা করে ওদের দেখাশোনা করার জন্য নীরা ছুটি নিয়ে বাড়ি থাকবে। কিন্তু নীরা ভাবে সেই কেন ছুটি নেবে? পালা করে কৌশিকও নিক। বাড়ির কাজের চাপে ওদের সম্পর্ক নষ্ট হতে লাগল। একে অপরের সাথে ঠিক ভাবে কথাও বলত না। অফিসেও একে অপরকে অপমান করার সুযোগ ছাড়ত না। শেষে দুজনেই ডিভোর্স নিয়ে নিয়েছিল। নীরা চাকরি ছেড়ে দিয়ে খড়গপুরে একটা চাকরি ধরল। তারপর দীর্ঘ দশ বছর আর যোগাযোগ ছিল না। দুজন নিজের চাকরি আর উন্নতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। 

গাড়িতে বসে নীরা মাঝে মাঝে কৌশিকের দিকে ঘুরে তাকাছিল। তার খুব খারাপ লাগছিল কৌশিককে এই ভাবে মাঝ রাতে কষ্ট দিতে। কৌশিক এক মনে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। নীরা বাড়িতে ফোন করলে বা বাড়ি থেকে ফোন এলে শুধু কৌশিক খবর জানার জন্য নীরার দিকে ফিরে তাকাছিল। নীরা খবরটা জানিয়ে দেওয়ার পর আবার কৌশিক এক মনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল। এতো লম্বা সফরে খুব প্রয়োজন ছাড়া একটাও কথা কৌশিক নীরাকে জিজ্ঞেস করেনি।

রাস্তা ফাঁকা ছিল, তাই ওরা সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্য দুর্গাপুরে নার্সিংহোমে ঢুকে গেল। মা নীরাকে দেখতে পেয়ে পায়ের তলায় জোর খুঁজে পেল। এতক্ষণ দিশাহারা হয়ে বসেছিল। ছুটে এসে নীরাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। নীরাও মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল। নীরার মা কৌশিককে দেখে বেশ খুশি হল। কৌশিক নীরার মায়ের পা ছুয়ে প্রণাম করল। নীরার মা কৌশিকের চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেল আর আশীর্বাদ করল, “জীবনে অনেক উন্নতি কর বাবা!”

  নীরার মা চিরকাল কৌশিককে খুব ভালোবাসে। তার মতে নীরা আর কৌশিকের ডিভোর্সের কারণ নীরাই। নীরার মায়ের ভাবনা বৌয়ের চোখে বরের মান সম্মান বারে যদি বর ভালো চাকরি করে আর  বরের চোখে ভালো বৌ সেই যে ভালো রান্না করতে পারে, ঘর ভালভাবে গুছিয়ে রাখতে পারে, সুন্দর ভাবে বাচ্চা মানুষ করতে পারে আর বাড়ির সবার যত্ন নিতে পারে। সেই দিক থেকে কৌশিক ভালো বর, যেহেতু খুব ভালো চাকরি করে, কিন্তু তার মেয়ে বৌ হিসেবে দক্ষ নয়। রান্না খুব ভালো জানে না। ঘর গোছানোতেও খুব একটা উৎসাহ নেই। নিজের যত্নই ঠিক নিতে পারে না। বাচ্চা তো নিতেই চায় না। তাই কৌশিকের পক্ষে এই ধরণের মেয়ের সাথে মানিয়ে না নিতে পারা খুব স্বাভাবিক।

নীরার বাবার শারীরিক অবস্থা একটু স্থিতিশীল হতে কৌশিক ফিরে গেল কোলকাতায়। নীরাকে বলে গেল, এখুনি কাজে যোগ দেওয়ার দরকার নেই, সে সামলে নেবে। বাবা আর একটু সুস্থ হলে এখান থেকেই কাজে জয়েন করে। পুরোপুরি ঠিক হলে নীরা কোলকাতায় ফিরে যায়, তার আগে নয়।

নীরা বুঝতে পারছিল না কৌশিকের কাছে কি ভাবে নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। কৌশিক ফিরে যাওয়ার সময় নীরা কৌশিকের হাত ধরে বলল, “তুমি না থাকলে কি হত আমি ভাবতেও পারছি না। আমি সার জীবন তোমার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম।”

কৌশিক হাল্কা করে নীরার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ইটস ওকে। আমি এমন কিছু করিনি। বাবা মায়ের খেয়াল করো।”

বাবা পুরো সুস্থ হয়ে যেত নীরা কোলকাতায় ফিরে গেল। কিন্তু এখন আর নীরা কৌশিককে এড়িয়ে চলে না। ওদের মধ্যে একটা সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠল। অফিসের কাজ একে অপরের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করে। কিন্তু কেউ কারও প্রতি বিশেষ আকর্ষণ দেখাত না। ওদের প্রোজেক্টের কাজ বেশ ভালোই এগিয়ে যাচ্ছিল। এক দিন তিস্তা নীরাকে বলেই ফেলল, “কদিন আগে অব্দি দেখতাম তুই কৌশিকদার থেকে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করতিস। এমন কি হল যে এখন বেশ সুন্দর ভাবে গল্প করিস কৌশিকদার সাথে। কৌশিকদাকে আমি অনেক দিন ধরে চিনি, কারও প্রতি আকৃষ্ট হতে দেখিনি। কিন্তু আজকাল দেখি তোকে একটু অন্য চোখে দেখে।” 

নীরা একটা মিষ্টি হাসি হেসে বলল, “না রে, আগে ভয় পেতাম, এখন আর ভয় পাই না।” ইচ্ছে করে সত্য কথা গোপন করে গেল নীরা। নিজের অতীত ঘাঁটতে চায়নি সে।

আরও কয়েক মাস যেতে একদিন কৌশিক অফিস এলো না। নীরা চিন্তায় পড়ে গেল। ও তো সহজে কামাই করে না। এক সহকর্মী জিজ্ঞেস করতে বুঝল কৌশিকের জ্বর হয়েছে। বাথরুমে গিয়ে কৌশিককে ফোন করল। কৌশিক মুখে বলল ভালো আছে, কিন্তু গলার আওয়াজে নীরা বুঝতে পারল কৌশিক খুব একটা ভালো নেই। অফিস শেষ হতেই সোজা কৌশিকের ফ্ল্যাটে চলে গেল। দু বছর এই ফ্ল্যাতেই ছিল তাই বিল্ডিং চিনতে অসুবিধে হয়নি। দশ বছর পরেও পানগুমটি, রঙ্গন গাছ সব ওই রকমই আছে। অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান সেই রবিদাই আছে। ওকে চিনতেও পারল। এতো দিন পরে দেখছে বলে একটু চমকে গেল। একটু হেসে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন বৌদি?”

বৌদি শুনে নীরার একটু অস্বস্তি হল। সেই সম্পর্ক অনেক আগে চুকে গেছে। তবুও কিছু বলেনি সেই ব্যাপারে। একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে নীরা দারোয়ানকে বলল, “ভালো, আপনি ভালো আছেন তো?”

দারোয়ান ওর সাথে লিফটের দিকে এগোতে এগোতে বলল, “ভালো আছি।” লিফটের কাছে এসে নীরাকে লিফটের দরজা খুলে দিল। নীরা উঠে লিফটের দরজা বন্ধ করে দিল আর চার টিপল। লিফট পাঁচতালায় এসে থামল। লিফট থেকে বেরিয়ে একটু বাঁ দিকে হাঁটতেই কৌশিকের ফ্ল্যাট। দরজার গায়ে নেম প্লেটে এখনও লেখা আছে কৌশিক ব্যানার্জি আর নীরা ব্যানার্জি। কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল নেম প্লেটের দিকে তারপর আস্তে করে হাত বাড়াল কলিংবেলের দিকে। কলিংবেল বাজার প্রায় দু মিনিট পর দরজা খুলল। সামনে নীরাকে দেখে কৌশিক চমকে গেল। বলল, “তুমি!”

নীরা বলল, “তোমার শরীর খারাপ শুনে এলাম। এখন কেমন আছো?”

কৌশিক নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, “একটু গরম আছে মনে হয়। টেম্পারেচার দেখিনি।”

নীরা আসার সময় প্যারাসিটামল আর থার্মোমিটার কিনেই এনেছিল। ব্যাগ থেকে থার্মোমিটার বার করে কৌশিকের টেম্পারেচার চেক করল, এক শো দুই জ্বর। নীরা কৌশিককে জিজ্ঞেস করল, “কিছু খেয়েছো?”

কৌশিক বলল, “কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, তাই খাইনি।”

নীরা রান্না ঘরে গিয়ে দেখল কিছু খাবার জিনিস আছে কি না। শুধু বিস্কুট চোখে পড়ল। ফ্রিজেও কিছু পেল না। র চা আর কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে এসে বলল, “এইগুলো খেয়ে নাও, তারপর জ্বরের ওষুধ দেব।”

কৌশিক বলল, “ইচ্ছে করছে না খেতে।”

নীরা একটা ধমক দিল, “চুপচাপ খেয়ে নাও।” ধমক দিয়েই নীরা লজ্জায় পড়ে গেল। এখন কৌশিকের উপরে তার সেই জোর থাকার কথা নয়। কৌশিক নীরার দিকে চেয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। দেখতে পেল দশ বছরের আগের নীরাকে। কৌশিক ভালো ছেলের মত চুপচাপ চা বিস্কুট খেয়ে নিল। নীরা একটু পরে ওষুধ আর জল কৌশিকের দিকে এগিয়ে দিল। সেটাও সে চুপচাপ খেয়ে নিল।

কৌশিকের ডেঙ্গু ধরা পড়ল। কৌশিক নিজেকে পুরোপুরি নীরার হাতে ছেড়ে দিল। নীরা নিজের বাড়ি গিয়ে নিজের কিছু জামা কাপড় আর কিছু প্রয়োজনের জিনিস নিয়ে চলে এল। নীরা রাতদিন জেগে কৌশিকের সেবা করে গেল। কৌশিকের গা স্পঞ্জ করাতে গিয়ে নীরা দশ বারো বছর আগেকার মধুর স্মৃতিতে হারিয়ে যেত আর নিজের অজান্তেই কৌশিককে জড়িয়ে ধরত। সাথে সাথে নিজের ভুল বুঝতে পারত আর ছেড়ে দিত। কৌশিক প্রথম কয়েকবার চমকে গিয়েছিল। নীরা জড়িয়ে ধরলে ওরও খুব ভালো লাগত, তাই তারপর থেকে নীরা ওকে জড়িয়ে ধরলে সেও নীরাকে জড়িয়ে ধরত। কৌশিক সুস্থ হতে লাগল আর সাথে সাথে ওদের সম্পর্কের গভীরতাও বাড়তে লাগল। জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো ওরা আবার খুঁজে পেতে লাগল। বিয়ের প্রথম দিকে যেমন তারা একে অপরকে সম্পূর্ণ রুপে পেত, ঠিক সেই মুহূর্ত আবার ওদের জীবনে ফিরে এল। 

 জ্বর একটু কমতে শুরু করতে নীরা কৌশিকের বাড়ি থেকে ওয়ার্ক ফ্রাম হোম শুরু করল, যেহেতু প্রোজেক্ট ম্যানেজার কৌশিক ছিল তাই অনুমতি পেতে অসুবিধে হয়নি। কৌশিক আরও একটু সুস্থ হতে নীরা কৌশিকের বাড়ি থেকেই অফিস যেতে শুরু করল আর কৌশিক বাড়ি থেকে ওয়ার্ক ফ্রাম হোম করতে লাগল। নীরা বাড়ি ফিরে এসে দেখতো কৌশিক ঘরটা সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রেখেছে। রান্নাও করে রেখেছে। ওর রান্না খেয়ে নীরা অবাক হয়ে একদিন বলল, “খুব ভালো রান্না করছো! কোথায় থেকে শিখলে?”

কৌশিক হাসতে হাসতে বলল, “সময় অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।” 

 কৌশিক পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেল। পরেরদিন থেকে কৌশিক অফিস যাবে মনস্থির করল। নীরা নিজের ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। ওকে ব্যাগ গোছাচ্ছে দেখে কৌশিক নীরাকে পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে বলল, “ব্যাগ গোছাচ্ছ কেন?”

নীরা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল, “তুমি পুরো সুস্থ হয়ে গেছো, তাই এবার আমার ফিরে যাওয়ার পালা।”

কৌশিক, “কি দরকার ভাড়া বাড়িতে পড়ে থাকার। চলো আবার থেকে নতুন ভাবে জীবন শুরু করি।”

নীরা কৌশিকের দিকে ঘুরল। দু হাত দিয়ে কৌশিকের গলা জড়িয়ে কৌশিকের চোখের দিকে তাকাল। কৌশিকের চোখের মধ্যে বিয়ের আগের ভালোবাসা আবার খুঁজে পেল। বলল, “তোমার এই ভালোবাসা আমি হারাতে চাই না। এক সাথে বেশিদিন থাকলে আমরা খুব হিসেবি হয়ে উঠি। কি দিলামের থেকে আমাদের কাছে কি পেলাম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের এই মিষ্টি সম্পর্ক বোজায় রাখতে একটু দূরেই থাকি। সুখে দুঃখে ঠিক এই ভাবেই একে অপরের পাশে থাকব।” 

কৌশিক কোন কথা বলতে পারছিল না। তারও নীরাকে ছাড়তে খুব কষ্ট হচ্ছিল। চোখ ছলছলে হয়ে এল। কিন্তু নীরার কথা যে কটু সত্য সেটা অস্বীকার করতেও পারছিল না। নীরা কৌশিকের ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বলল, “চলি”। আস্তে করে নিজেকে কৌশিকের বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগোল। জানে আর এক মুহূর্ত থাকলে দুর্বল হয়ে পড়বে।       

 সুনন্দী কামাথ

(সমাপ্ত)

কতোটা ভালোবাসো

কতোটা ভালোবাসো


 দীপান্বিতা-- কতোটা ভালোবাসো বলো দেখি!

তন্ময়-- তোমাকে ভালোবাসার দুঃসাহস আমার নেই। তবে তুমি চাইলে, কোনো এক শীতের রাতে হাতে হাত রেখে হলুদ আলোর ছাওয়ায় অনেকটা পথ হেঁটে যেতে পারি।

দীপান্বিতা-- আর কী পারো?

তন্ময়-- বসন্তের বিকেলে সবুজ পাতার অলংকার গড়ে দিতে পারি। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামলে, ঠিক করে দিতে পারি।

দীপান্বিতা-- আর?

তন্ময়-- মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বাইরের বারান্দায় তুমি এসে দাঁড়ালে, তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পাড়ি।

দীপান্বিতা-- কিন্তু, মাঝরাতে ঘুম ভাঙবে কেন? 

তন্ময়-- সবটা কী আর মানুষের নিজের হাতে থাকে গো দীপা! সবার কাছে নিজেকে আড়াল করতে গিয়ে, শেষ অবধি নিজেকেই নিজের কাছে আড়াল করে ফেলে। তখন তো নিজের শরীরটা অবধি নিজের কথায় চলে না।

দীপান্বিতা-- সে নাহয় তুমি ই ঘুম পাড়িয়ে দিলে।

তন্ময়-- সে পারি। তবে অভিমানে জেগে থাকা জরুরি। ঘুমিয়ে পড়লে ওরা লুকিয়ে পড়ে। পরে সময় মতো রাগ হয়ে বেরিয়ে আসে। আমার উপর রাগ করতে দেবো না তোমায়।

দীপান্বিতা-- কিন্তু এইটুকু তে জীবন চলে না, তা কি বোঝো? বাস্তব না চিনলে ভালোবাসা চলে শুনি। কিন্তু সংসার করা তো সহজ নয়।

তন্ময়-- তবে, আজ থেকে ভালোবাসার দ্বায়িত্ব আমি নিলেম। সংসার এর দ্বায়িত্ব তুমি ই নাও। তারপর সময় করে আমাকেও বাস্তব টুকু চিনিয়ে দিও না হয়।

অতিরিক্ত বাস্তব সচেতন দীপান্বিতার চোখেও নদীর টান আসে। বালির কোনে কোনে জল চিকচিক করে হলুদ আলোয়। তন্ময় ওর চোখ মুছিয়ে দেয়। বাস্তবের শক্ত মেয়েটা ভেজা গলায় বলে, " বাস্তব শিখে কাজ নেই। তুমি শুধু আমার বাস্তব হয়েই থেকো।"

দীপান্বিতা কে কাছে টেনে নিলে তন্ময়। হাতে হাত রাখলে শুনি সাহস বাড়ে। হলুদ আলোয় তন্ময়ের চোখে সাহস ভিড় করে আসে। দীপান্বিতা আজকে একটু ভীতু হয়েই ওর হাত শক্ত করে ধরে থাকে। আবেগ থাকলে কিছু কিছু সময় ভীতু হতেও ভালো লাগে। সাহসী হয়ে সবসময় আবেগ গুলোকে দূরে না রাখলেই হলো। ওরাই যে ভালো থাকতে, ভালো রাখতে শেখায়।।

- অনিবেন্দ্র রায়চৌধুরী

একটি রাত তিনটি জীবন - ৪

 


_বাঃ, এটা তো খুব ভালো কথা।

চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো সোমনাথ । আলতাফের কীধে হাত রেখে বললো, এটা যা বললে, তাতে আমি

সত্যিকারের খুশি হলাম । এমন করে ক'জন ভাবে? মাঝে মাঝে এসো, আলতাফ, তোমাকে দেখলে আমার

ভালো লাগবে ।

একটি রাত তিনটি জীবন - ৩

 

বাসবী গল্প করার মেজাজে আছে। সোমনাথ তবু উঠে দীড়ালো। বাসবী আপত্তি করলো না | সে বললো হ্যা,

এবার তোমার যাওয়া দরকার । দরজার কাছে এসে সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো, তুমি এত সাজগোজ করে আছে

কেন? কোথাও বেরুবে বুঝি?

একটি রাত তিনটি জীবন - ২

 

বাসবী বললো হ্যা। তুমি আমাকে একবারও বসতে বললে না? সোমনাথ ইতস্তত করে বললো, তুমি আমার এখানে... রাত হয়ে গেছে .... আমি একটু ড্রিংক করেছি।

একটি রাত তিনটি জীবন - ১

সুনীল গঙ্গপাধ্য্যায়

হাসপাতালে সারাক্ষণ এত কাজ যে সোমনাথ অন্য কোনো দিকে মন দিতেই পারে না। এক সময় তার খেয়ার হয়, সারাদিনে সে একবারও হাসেনি। রোগীদের সঙ্গে সর্বক্ষণ শুধু জবীলা-যন্ত্রণা আর দুঃখ-কষ্ট নিয়েই কথা হয়, তার মধ্যে হাসির খোরাক থাকে না। অথচ গোমড়ামুখো হয়ে কি মানুষ বাচতে পারে?

সেই ছেলেটা


 চেম্বার থেকে বেরিয়েই দেখি, আবহাওয়ার বেহাল অবস্থা l কৃষ্ণমেঘের চাদরে পুরো আকাশটা ঢেকে গেছে l বুঝলাম, কপালে দুর্ভোগ আছে l মনে মনে, খুব রাগ হল, আজকেই আমার প্রাইভেট কারটাকে  খারাপ হতে হল l চেম্বারে আসার সময় একটা আন্দাজ করেছিলাম , প্রকৃতির মেজাজ ক্ষিপ্ত আছে, কিন্তু এতটাও খারাপ হবে, ভাবিনি l যাই হোক, এখন আমাকে বিষ্ণুপুর থেকে যেতে হবে চাকদহ স্টেশনে, সেখান থেকে কল্যাণী l বাসে উঠেই জানলার ধারে সিট পেয়ে গেলাম l বেশ লাগছিলো, ঠান্ডা হওয়ার স্পর্শ সারাদিনের  ক্লান্তি ঘুচিয়ে দিলো, বহুদিন এমন শান্তি পাইনি,এমন শান্তি শুধু মায়ের কোলেই পাওয়া যায় l

 চাকদহ বাসস্ট্যান্ডে বাস থামলো l নেমে দেখলাম, আকাশের আরও অবনতি ঘটেছে l ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে l এখন আর সেই সাময়িক আরাম, আমার মনে  শান্তি দিচ্ছেনা, বরং চিন্তা হতে লাগলো যে, কী করে বাড়ি পৌঁছবো l  ভাবতে ভাবতে স্টেশনে চলে এলাম l স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম, স্টেশনে লোক সংখ্যা হাতে গুনে বলা যাবে l স্টেশনের উপরে সব দোকানও বন্ধ হয়ে গেছে l হবেই তো, অনেক রাত যে হলো l শুধু সুবলদার চায়ের দোকানটা খোলা ছিল l  সুবলদার সঙ্গে আমার বহুদিনের আলাপ l আমি যখন প্রথম প্রথম চাকদায় আসতাম, ট্রেনেই আসতাম, তখন ওনার দোকানের চা খেতাম l ভারী ভালো মানুষ, সরল মানুষ l সুবলদাও দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে আমায় দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এলেন : আরে! ডাক্তার বাবু! অনেকদিন পর! তা হঠাৎ স্টেশনে! কী ব্যাপার?'

আমি : ' আর বলবেননা দাদা! আমার প্রাইভেট কার খারাপ হয়ে গেছে l তাই ট্রেনে করে কল্যাণী যাব l কখন ট্রেন আছে দাদা?'

সুবলদা  : 'আরে ডাক্তারবাবু, আজ রাতে এদিকের সব ট্রেন বাতিল l কদিন ধরে যা বৃষ্টি হয়েছে,এদিকের লাইনে জল জমে গেছে l কাল ভোর ৫টার আগে ট্রেন নেই l আপনি বরং  আজকের রাতটা ওয়েটিং রুমে কাটিয়ে দিন l একটু সামনে এগিয়ে যান, একটা তরকা রুটির দোকান এখনও খোলা পাবেন l খেয়ে নেবেন l ওয়েটিং রুমে আপনার আশা করি অসুবিধা হবেনা l একটা রাত একটু কষ্ট করুন l ভোর ৫টায় ট্রেন পেয়ে যাবেন l'

সুবল দা ছাতা মাথায় দিয়ে এগিয়ে গেলেন l যা ভেবেছিলাম তাই হলো, দুর্ভোগের সূচনা হয়ে গেল l  সামনের দোকান থেকে রুটি আর তরকা কিনে খেয়ে, ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলাম l হঠাৎ দেখি আমার ফোনটা বেজে উঠলো l ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো 'জয়দীপ ইস কলিং ' l জয়দীপ, আমার ছোটবেলার বন্ধু, পেশায় উকিল, ওই আমার কেসটা নেবে l ফোনটা রিসিভ করেই বললাম : '   বল জয়দীপ l'

ফোনের ওপাশ থেকে জয়দীপের গম্ভীর কণ্ঠস্বর : ' শোন মৃদুল,  এই রবিবার তু্ই কিন্তু আমার বাড়িতে আসিস l আমি বাড়িতে থাকবো l'

আমি : ' হ্যাঁ অবশ্যই যাব l তোর সাথে অনেক কথাও আছে l'

জয়দীপ  : 'তু্ই কী সিরিয়াস? আমি আবার বলছি, কোনো ডিসিশন নেওয়ার আগে বারবার ভেবে দেখ l'

আমার গলা ভারী হয়ে এলো l আমি মনে শক্তি সঞ্চয় করেই বললাম : 'ইয়েস, আই অ্যাম সিরিয়াস l এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই l শোন আমি রাস্তায় l তোকে বাড়ি পৌঁছে ফোন করছি l'

ফোনটা রাখার পর, মনের মধ্যে হাজার হাজার স্মৃতি ভিড় করলো l মল্লিকার সাথে আমার প্রথম দেখা, এক সাথে কত স্বপ্নের মায়াজাল বোনা, কতো কমিটমেন্ট, কতো সুন্দর মুহূর্ত, কখনো ভাবিনি, এমন দিন আসবে l কিন্তু সুখস্মৃতির পর্দা নিমেষে ছিঁড়ে পরক্ষনেই উপচে পড়ল, তিক্ত স্মৃতির বিষক্রিয়া l একে অপরের প্রতি শুধু অভিযোগ, দোষারোপ l না ও আমায় বুঝেছে, না আমি ওকে l শুধু না পাওয়া, অভিমান, অভিযোগের পাহাড়ে অশান্তি আর অশান্তি l অসহ্য, তার থেকে দুজনে দুজনের মতো শান্তিতে থাকাই শ্রেয় l চিন্তা করতে করতে আমার মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা হতে লাগলো, আমি চোখ বুজে ফেললাম l চোখের সামনে ভেসে এলো আমার ছেলে ঈশানের নিষ্পাপ মুখ l এমন সময়  হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম l ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে বারোটা, আমি একাই ওয়েটিং রুমে বসে l ওয়েটিং রুম থেকে দেখছি আকাশ ছিন্ন করে জলধর তার সর্বশেষ জলবিন্দু  দিয়ে হলেও নির্জন শহরকে ধুয়ে , যেন তার সমস্ত কালিমা মুছে দিচ্ছে l গোটা শহর আজ স্নাত, পরিশুদ্ধ l

আমার চোখটা বুজে এলো l আবার ঈশানের মুখ ভেসে উঠলো l আচ্ছা, নিশ্চয়ই মল্লিকাই ওর কাস্টডি পাবে, মা বলে কথা l তখন ঈশানকে ও আমার কাছে আসতে দেবে? খুব মিস করবো ঈশানকে l আমি যে ওকে খুব ভালোবাসি l ভাবতে ভাবতে, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম l  হঠাৎ শুনতে পেলাম :

'কাকু! ও কাকু!'

আচমকা, আমার ঘুম ভেঙে গেল l চোখ খুলে দেখলাম, আমার সামনে একটা তেরো - চৌদ্দ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে l পরনে একটা টি শার্ট আর হাফ প্যান্ট l দেখে ভদ্র ঘরের ছেলেই মনে হচ্ছে l আমি অবাক হলাম, এতো রাতে একা একটা বাচ্চা ছেলে,এখানে কী করছে?

ছেলেটি আবার বলল  : 'কাকু! ট্রেন কখন আসবে?'

আমি : 'ভোর ৫টার আগে ট্রেন নেই l তুমি কোথায় যাবে?'

ছেলেটি : ' ব্যারাকপুর l'

আমার যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টি গেলো,  আমি আর এই ছেলেটি ছাড়া, আর কেউ চোখে পড়লোনা l এমনকি স্টেশনে একটা কুকুর পর্যন্ত নেই l আমি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম : ' তোমার সাথে কে আছেন?'

ছেলেটি : 'কে থাকবে? কেউ নেই l আমি একাই যাবো l'

আমি আরও অবাক হলাম : 'এতো রাতে একা?'

ছেলেটি : ' তো কী হয়েছে? আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি l একাই যেতে পারবো l'

আমি বুঝলাম, ডেপো ছেলে l সবে গোঁফের রেখা উঠেছে তো , তাই নিজেকে হিরো দেব ভাবছে l হয় হয়, এই বয়সে এমন হয় lমনে হয়, বাড়ি থেকে পালিয়েছে l সকাল হলেই, জি. আর. পি. এফ এর কাছে দিয়ে আসবো l কোন বাড়ির ছেলে, কে জানে l আমি এবারে জিজ্ঞাসা করলাম : 'তোমার নাম কী? ব্যারাকপুরে কারোর বাড়ি যাচ্ছো?'

ছেলেটি : 'আমার নাম ঋদ্ধি l আমি ব্যারাকপুরে আমার দিদির বাড়ি যাচ্ছি l'

আমি কৌতূহলী হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম : ' কেন জানতে পারি? '

ঋদ্ধি মুখ বেকিয়েই বলল  : 'আর বলোনা কাকু! মা বাবা শুধু ঝগড়া করে l আমার একদম ভালো লাগেনা l তাই আমি দিদির কাছে চলে যাবো l'

আমি : 'মা বাবা ঝগড়া করলে বুঝি এভাবে চলে যেতে হয়? তুমি মা বাবাকে বোঝাও, যাতে তারা ঝগড়া না করেন l'

ঋদ্ধি  : 'ওরা বুঝবেনা l ওরা শুধু ঝগড়া করবে l চিৎকার করবে l আর আমি দরজা বন্ধ করে কান চেপে রাখি l আমার মাথায় যন্ত্রনা করে, আমি ওদের চিৎকার সহ্য করতে পারিনা l আমি পড়াশোনা করতে পারিনা l'

আমার মনে আবার ঈশানের মুখ ভেসে এলো l আমার আর মল্লিকার যখন ঝগড়া হয়, তখনও হয়তো ঈশান এইভাবেই ভয়ে কুঁকড়ে থাকে l কিংবা হয়তো ওরও খুব কষ্ট হয় l

ঋদ্ধি বলতেই লাগলো : 'জানোতো কাকু, মা বাবা আগে খুব ভালো ছিল l আমরা তিনজনে মিলে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলাম l কতো মজা করেছি l ওরা যখন ঝগড়া করে, আমি পুরীর সেই ছবিগুলো দেখি l মনে হয় আবার এমন দিন কবে আসবে l বাবাকে যখন বলি  বাবা পুরী যাবো l বাবা বলে, সামার ভ্যাকেশনে যাবো l সামার ভ্যাকেশন এলে  বলে পুজোর ছুটিতে যাবো l আসলে আমি জানি, বাবা আমাদের আর পুরীতে নিয়ে যাবেনা l '

আমার আবার ঈশানের কথাই মনে পড়ল l ঈশানও তো ভূগোল বইতে কাঞ্চনজঙ্ঘা সম্পর্কে পড়ে, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে চেয়েছিলো l বলেছিল পুজোর ছুটিতে নিয়ে যেতে l আমিও ওকে কথা দিয়েছিলাম যে, নিয়ে যাবো l

ঋদ্ধি আরও বলতে লাগলো : 'জানোতো কাকু, আগে দুর্গাপুজোর সময় আমি, মা বাবা দুজনের সাথে ঠাকুর দেখতে যেতাম, কতো মজা হতো l এখন হয় মা আমায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যায়, নয় বাবা আমায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যায় l আমি মা বাবা একসাথে কোথাও যাইনি, একসাথে খাইনি, একসাথে গল্প করিনি - কতদিন হয়ে গেলো l ওরা খুব ঝগড়া করে l বলছে আলাদা আলাদা থাকবে l আমি শুনেছি l কিন্তু আমার খুব কষ্ট হবেl আমি তো দুজনের সাথেই থাকতে চাই l আমার আর ভালো লাগছেনা l তাই আমি দিদির কাছে যাবো l'

আমার কাছে তো ঋদ্ধি, ঈশানের মতোই l ঈশানেরও হয়তো এমনটা মনে হয় l এতোদিন এতো অশান্তি, জ্বালা যন্ত্রণার মধ্যে আমি আর মল্লিকা কেউই ঈশানকে নিয়ে তো একবারও ভাবিনি, যে ও কী চায় l আমি আবার চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলাম l কানে এলো- 

'ডাক্তারবাবু, কাল রাত কেমন কাটল? আপনার ট্রেন আসার সময় তো হয়ে এলো l'

সামনে তাকাতে দেখতে পেলাম সুবলদা দোকানের ঝাঁপি তুলছেন l রাতের কালিমা কেটে সূর্যদেব সহাস্যে জাগ্রত হয়েছেন l কিন্তু,পাশে তাকাতেই বুকটা ছ্যাক করে উঠলো  - একি! ছেলেটা কোথায়? কোথায় গেলো? আমি দৌড়ে ওয়েটিং রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি,কোত্থাও ছেলেটি নেই l

আমি প্রায় হন্তদন্ত হয়ে সুবলদাকে জিজ্ঞাসা করলাম :'দাদা একটা বাচ্চা ছেলেকে কী আপনি দেখেছেন? তেরো চৌদ্দ বছর হবে l হাফ প্যান্ট আর টি শার্ট পড়া l'

সুবলদা বিস্মিত হয়েই বললেন  : ' না তো ডাক্তাবাবু! কাউকে দেখিনি l তবে দিন সাতেক আগে একটা তেরো চৌদ্দ বছরের ছেলে ট্রেনে কাটা পড়েছিল l সে নাকি তাড়াতাড়ি দৌড়ে লাইন পার হতে গিয়েছিল l আর ওই সময় ট্রেন দিয়েছে ধাক্কা l'

আমি শুনে স্তব্ধ, বাক্যহারা l নিজের চোখ, কান, পঞ্চইন্দ্রিয়কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না l একটা জ্বলজ্যান্ত ছেলে এভাবে নিমেষে উধাও হয়ে গেল l আবার আমার ফোনটা বেজে উঠলো l ফোনটা বের করতেই দেখলাম, স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে - ' মল্লিকা ইস কলিং l' ফোনটা কানে দিয়ে বললাম : 'হ্যাঁ, বলো 'l

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো মল্লিকার কাতর কণ্ঠস্বর : ' শোনো, বলছি,তুমি কী আজকে আমার বাড়িতে আসতে পারবে? ঈশানের খুব জ্বর l কাল রাতে কাঁদতে কাঁদতে ওর জ্বর এসে গেছে l ও মনে হয় আমাদের ব্যাপারটা বুঝে গেছে আর আপসেট হয়ে পড়েছে l সবকিছু ভুলে নতুন করে কী আবার শুরু করা যায়না? অন্তত ঈশানের জন্য?'

আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো l আমি বললাম : 'এই ব্যাপারে তোমার সাথে আমিও কথা বলবো মল্লিকা l আমি  যাবো l ঈশানকে দেখে রেখো l'

ভুল তো মানুষ মাত্রই করে l আবার ভুল থেকেই 

 তো মানুষের শিক্ষা  হয় l আমরাও ভুল করেছিলাম l এখন সেই ভুলগুলোকে শুধরে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হবে, ঈশানের জন্য, আমাদের নিজেদের জন্য l গতকাল রাতের  বারিধারা শহরের কালিমার সাথে সাথে, আমার মনের কালিমা, আর ভুলগুলোকে যেন ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে l আজকের সকালটা যেন আমার নবজীবনের নবসকাল l

ইতিমধ্যে ট্রেন চলে এসেছে l ভোরের ট্রেন তো, বেশ ফাঁকা l ভোরের মিঠে আলোতে ট্রেনের কামরার ভিতরটাও সোনালী আভায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে lমনটাও বেশ হালকা লাগছে l মনে হচ্ছে, এতদিনের বহন করা কতো বোঝা, কতো ভার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এসেছি l তবে,একটা প্রশ্ন মনে বারবার আসছে,হয়তো এই প্রশ্ন আমার মনে সারাজীবন থেকেও যাবে -  মাঝরাতে আসা যে ছেলেটি এতক্ষন ধরে  আমার সাথে এতো কথা বলল - সে কী আদৌ মানুষ? নাকি কোনো দেবদূত? নাকি ট্রেনে কাটা পড়া সেই ছেলেটির..............????

লিখেছেন...

Sayani Gupta Banerjee


কে বলে আমার সন্তান মানুষ হয়নি - এক মাস্টারমশায়ের গল্প


 

একটা আন্তর্জাতিক সেমিনার শেষে দেশে ফিরছিলাম। প্লেনে উঠে সুন্দরী এয়ার হোস্টেসের দেখিয়ে দেওয়া সিটে আরাম করে বসলাম। প্রায় পনেরো ঘণ্টার একঘেয়ে ননস্টপ জার্নি। আটলান্টিকের উপর দিয়ে বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল কে একপাশে রেখে উড়ে যাবো প্রথমে দুবাই। সেখান থেকে আবার কলকাতায় নিজের দেশে। যদিও এই বিদেশী এয়ারওয়েসের ব্যবস্থা খুব ভাল তবুও এত লম্বা জার্নি করতে ভাল লাগে না আর।

একটা গল্পের বই এর পাতায় চোখ রেখেছিলাম। তখনো টেক-অফ করতে একটু দেরি ছিল। হঠাৎ কানে ভেসে এলো বঙ্গভাষা। যথারীতি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝে নিলাম কথার উৎস স্থল আমার সামনের রো ছেড়ে তার পরের রো। এখান থেকে যেটুকু চোখে পরল এক জোড়া বৃদ্ধ বৃদ্ধা ; একজনের চকচকে টাকের চারপাশে সাদা পাকা চুলের সমারোহ, অন্য আরেক জনের সাদা চুলের খোপার মাঝে কয়েকটা কালো চুল কিছুটা যেন বলছে স্মৃতি টুকু থাক। খুব নিচু স্বরে উত্তপ্ত কিছু আলোচনা হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম। এভাবে উঁকিঝুঁকি মারাটা অশোভন, তাই নিজেকে সংযত করে গল্পের বইয়ের পাতায় মন দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু টুকরো টুকরো কয়েকটা শব্দ ভেসে এসে আমার কানে ঢুকছিল, তার মধ্যে আমার জন্মস্থানের নামটা দুবার কানে আসায় কৌতূহল বেড়েই চলল। টয়লেট ঘুরে ফেরার সময় ভাল করে লক্ষ্য করলাম।

বহু বছর পর আমার স্কুলের হেড স‍‍্যার শ্রী শুভময় চ‍‍্যাটার্জীকে দেখে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল। ততক্ষণে প্লেন মাঝ আকাশে। ওনাদের পাশের সিটটা খালি দেখে এয়ার হোস্টেস কে বলে ওখানেই বসলাম। আমি বসায় ওনারা চুপ করে গেছিলেন। আমি হাত জোর করে নমস্কার করে বললাম -"স‍‍্যার, আমি নীলাদ্রী ঘোষাল। ৯২ র মাধ্যমিকের ব্যাচ স‍‍্যার, মনে পরছে?"

হাই পাওয়ার লেন্সের ভেতর থেকে দুটো ঘোলাটে চোখ আমার দিকে ফিরে তাকাল। আস্তে আস্তে চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠে সারা মুখে সেই সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পরল। বললেন - "নীল..... ঘোষাল বাবুর ছেলে!! শুনেছিলাম বড় বিজ্ঞানী হয়েছিস, খুব নাম হয়েছে তোর..."

শেষ কথাটায় কেমন একটা শ্লেষের সুর বেজে উঠলো। মাসিমাকে নমস্কার করে বললাম - "সুজয়দার কাছে এসেছিলেন?"

সুজয়দা হেড স‍‍্যারের একমাত্র ছেলে, আমার থেকে দু বছরের সিনিয়র ছিল। বড় ইঞ্জিনিয়ার, পিটসবার্গে থাকে জানতাম।

মাসিমা মাথা নেড়ে মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে চেয়ে মেঘ দেখতে লাগলেন। স‍‍্যার ও গম্ভীর হয়ে গেছিলেন। বললাম, - "কতদিন ছিলেন ওখানে? কোথায় কোথায় ঘুরলেন স‍‍্যার?"

- "ছিলাম প্রায় দুমাস। ছেলে আর বৌ খুব ব্যস্ত, তাও ঘুরিয়েছে টুকটাক।" স‍‍্যার বললেন।

একবার মনে হল নিজের সিটে ফিরে যাই, ওনারা বোধহয় কথা বলতে চাইছেন না। কিন্তু যেতে গিয়েও পারলাম না। হেডস্যারের কাছে দীর্ঘদিন পড়েছিলাম, খুব কাছ থেকে ওনাকে দেখেছিলাম। উনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এতো সুন্দর করে সব কিছু বোঝাতেন, পড়ানো ছাড়াও অনেক কিছুই ওনার থেকে শিখেছিলাম। পয়সা নিয়ে প্রাইভেটে উনি কোনোদিন পড়ান নি। তবে আমাদের পাশের চা বাগানের বস্তি গুলোতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বিনা-পয়সায় অনেককে পড়াতেন। এছাড়া বই পত্র দিয়ে গরীব ছাত্রদের যথেষ্ট সাহায্য করতেন। কত গরীব ছাত্রর পরীক্ষার ফি দিয়ে দিতেন প্রতিবছর। 

মাধ্যমিকের আগে বাবার ভীষণ শরীর খারাপ হয়েছিল। বহুদিন বাবা বিছানায় ছিল। জমানো টাকা কড়ি সব শেষের দিকে। আমাদের একটুকরো জমি মা বিক্রি করবে ভেবেছিল সে সময়। কিন্তু স‍‍্যার কোথা থেকে খবর পেয়ে একদিন এসে মাকে বলেছিলেন জমি বিক্রি করতে না।আমার দায়িত্ব উনি নিয়েছিলেন। কয়েক মাস ওনার বাড়ি খাওয়া দাওয়া করে পড়াশোনা করেছিলাম। মাসিমা নিজেদের গরুর দুধ, গাছের ফল , পুকুরের মাছ, লাউ , কুমড়ো শীতের সবজি সব আমার হাত দিয়ে মা কে পাঠাতেন। আমাদের গাছের নারকেল সুপুরি স‍‍্যার নিজে দাঁড়িয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই টাকায় বাবার চিকিৎসা হয়েছিল।

কোনোদিনও কোনো ছাত্রকে বকতে বা শাস্তি দিতে দেখি নি ওনাকে। একবার আমার বন্ধু তরুণ কারো টিফিন চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পরেছিল। তরুণের মা পাঁচ বাড়ি কাজ করে ওকে পড়াতো।ও টিফিন কখনোই আনত না। স‍‍্যার সব জানতে পেরে ওকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাইয়ে ছিলেন। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন দুপুরেই স‍‍্যারের বাড়ি ওকে খেতে ডাকতেন মাসিমা।

মাসিমার ছিল দয়ার শরীর, সব ছাত্রদের মাতৃস্নেহে ভালবাসতেন। আমরা কখনো কোনো কাজে গেলে মাসিমার হাতের নাড়ু , তক্তি খেয়ে আসতাম। সুজয়দা পড়াশোনায় মেধাবী ছিল। অনেক কষ্টে স‍‍্যার ওকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়ে ছিলেন। স‍‍্যারের ইচ্ছা ছিল না ও বিদেশে যাক। স‍‍্যার পড়ানোর সময় সর্বদা বলতেন দেশের সব স্কলার ছেলেরা বাইরে চলে গেলে দেশের উন্নতি হবে কি করে? আজ নিজের খুব লজ্জা লাগছিল এই কথাটা মনে পরায়। আমিও বহু বছর বাড়ির বাইরে, যদিও দেশের মাটিতে বসেই আমি গবেষণা করছি।

আমিও স‍‍্যারের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ডাক্তারি পাস করে প্রথম কিছুদিন এক গ্রামীণ হাসপাতালে ছিলাম। রাজনৈতিক পার্টির দাপটে আর রুগীদের আত্মীয় দের অত্যাচারে সব নীতি বিসর্জন দিয়ে কয়েক মাসেই পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর পড়তে বাইরে এসে গবেষণায় ঢুকে গেছিলাম। বিদেশে কাটিয়েছি বহু বছর। বাবা মা বহুবার ফিরতে বললেও ফিরতে পারি নি। অবশেষে বাবা মারা যেতে ফিরে এসেছিলাম।তারপর গবেষণার জন্য ব‍‍্যঙ্গালোরে চলে যাই। গত পাঁচ বছর ব‍‍্যঙ্গালোরেই আছি। 

একটা এয়ার বাম্পে পরে প্লেনটা লাফিয়ে ওঠায় সম্বিত ফিরল। দেখলাম স‍‍্যার একটা বই পড়ছেন। এয়ার হোষ্টেস সবাইকে খাবার দিচ্ছিলেন। ওনারা নিরামিষ খাবার নিলেন। স‍‍্যার আমায় জিজ্ঞেস করলেন - "তোর ফ‍‍্যামেলি কোথায়? একা যাচ্ছিস !!"

আবার একটা ধাক্কা, ঝনক আমাকে ছেড়ে চলে গেছির দশ বছর আগেই। আসলে বিদেশে এসে আমার কাজের চাপ এতো বেশি ছিল ওকে সময় দিতে পারতাম না। ওর কোনো বন্ধু ছিল না। একা কোথাও যেতে পারতো না। অবসাদে ভুগে ভুগে শেষ হয়ে যাচ্ছিল ও। দশ বছর আগে ফিরে গেছিল একাই। যদিও ডিভোর্স হয় নি কিন্তু যোগাযোগ ছিল না বহু বছর। ও ওর বাবা মা এর কাছেই থাকত। দেশে ফিরে ফোনে কয়েকবার কথা হয়েছিল। একবার দেখা করেছিলাম। স‍‍্যারকে অর্ধসত্য বললাম যে ও দেশেই আছে।

মাসিমা বললেন - "বাঃ, ভাল, তোমার মা অন্তত বৌ নাতি নাতনি নিয়ে আনন্দে আছেন তাহলে।" লজ্জায় তাকাতে পারছিলাম না।

মাসিমা বলে চলেছিলেন - "আমার ছেলেটা কি করে এতো বদলে গেল জানি না। আমাদের বোধহয় কোথাও কোনো ফাঁক ছিল।" ওনার চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পরল।

- "আঃ, কি হচ্ছে!! নিজেকে সামলাও।"  স‍‍্যার একটা চাপা ধমক দিলেন যেটা ওনার চরিত্রের সাথে বেমানান। 

- "কেন চুপ করবো? এভাবে ফিরে যাচ্ছি..... ওখানে গিয়ে সবাইকে কি বলবো বল তো? জমি বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে এলে তুমি ...."

- "সে কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। আগে তো পৌঁছাই।" স‍‍্যার উত্তর দিলেন।

বুঝতে পারছিলাম কোথাও তাল কেটে গেছে। বললাম - "স‍‍্যার, আমি আপনার ছেলের মতো। আমাকে খুলে বলবেন কি হয়েছে? যদি আমি কিছু করতে পারি ........"

- "সবে চার ঘণ্টা কেটেছে। এখনো ১১ ঘণ্টার পথ বাকি। তুই দেশে ফেরার আগেই সব জেনে যাবি।" স‍‍্যার একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।

-  "সুজয় আর ওর বৌ বহু বছর বিদেশে। বহু বছর পর এ বছর সুজয়ের ছেলে হয়েছিল, বহুদিন ওরা দেশে আসে না। সুজয় আমাদের পাকাপাকি ওর কাছে চলে আসতে বলেছিল অনেক দিন ধরেই। ওরা ওদেশের গ্রীনকার্ড পেয়ে গেছিল। এতদিন আসি নি। কিন্তু নাতির ফটো দেখে তোর মাসিমাকে আর রাখতে পারলাম না। সুজয় চাইছিল আমরা পাকাপাকি ভাবে চলে যাই। ও নিজে এসে সব ব্যবস্থা করে জমি বাড়ি সব বিক্রি করে আমাদের নিয়ে গেছির দু মাস আগে। আমার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু এই বেকার বৃদ্ধর কথায় কেউ কান দেয় নি। এখানে এসেই বুঝলাম ওদের আসলে বাচ্চা দেখার জন্য আয়ার দরকার ছিল। ক্রেস গুলো ছমাসের আগে বাচ্চা নেবে না। বৌমা বাধ্য হয়ে আমাদের আনিয়েছিল। বাচ্চার ছমাস হতেই ওকে ক্রেসে দিয়ে আমাদের ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিল ছেলে। বলল শীত আসছে, আমাদের কষ্ট হবে ঠাণ্ডায়। কোনও বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে নেট ঘেঁটে।" স‍‍্যার এটুকু বলেই চোখ বুঝলেন।

- "বাচ্চাটা এই দুমাসেই আমাদের ন্যাওটা হয়ে গেছিল। খুব মুখ চিনত। দেখলেই দু হাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চাইত।" মাসিমা কান্না ভেজা গলায় বললেন।

- "জমি বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছি। টাকা পয়সা সব নাতির নামে করে দিয়েছিলাম। আমাদের আর কি প্রয়োজন!! কিন্তু এখন ভাবছি কি করবো!!" স‍‍্যার বললেন।

সুজয়দাকে যতটুকু দেখেছিলাম পড়াশোনা ছাড়া কিছুই জানত না। আজ নিজের বাবা মা কে এভাবে অবহেলা করেছে শুনে খুব রাগ হল। আমাদের পাশের বাড়ির নগেন জেঠুর ছেলে কলকাতায় ভাল চাকরী করতো। বাবা মা কে সেভাবে দেখত না। বহু পুরানো জরাজীর্ণ বাড়ি ভেঙ্গে পরছিল। মেরামতের দরকার ছিল। ওনাদের ও চিকিৎসার দরকার ছিল। স‍‍্যার স্কুলের সব ছাত্রদের নিয়ে নিজেই ওনাদের বাড়ি মেরামত করে দিয়েছিলেন। চিকিৎসাও করিয়েছিলেন। এমনি টুকরো টুকরো বহু কথা মনে পরছিল।

আলম বলে একটা মুসলিম ছেলে পড়তো আমাদের সাথে। ওর বাবা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পরে গুলি লেগে মারা গেছিল। সবাই ওকে একঘরে করেছিল ডাকাতের ছেলে বলে। একমাত্র স‍‍্যার আমাদের বুঝিয়ে বলেছিলেন কেউ শখ করে ডাকাত হয় না। আর ওতে আলমের কোনো দোষ নেই তাও বলেছিলেন। সস্নেহে আলমের চোখের জল মুছিয়ে ওকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সেই আলম আজ একটা এনজিও চালায়। বন্ধ চা বাগানের পরিবার গুলোকে সাহায্য করে নানা ভাবে। সেদিন স‍‍্যার ওর পাশে না দাঁড়ালে ভেসে যেতো ও। হয়তো বাবার থেকেও বড় ডাকাত তৈরি হত একদিন।

আমাদের উত্তরবঙ্গে বর্ষা কালে পাহাড়ি নদীতে খুব হড়কা বান আসতো। সেবার নাগরাকাটা টাউনটা রাতারাতি ভেসে গেছিল ডায়না নদীর জলে। কত লোক যে গৃহহারা হয়েছিল হিসাব নেই। গরমের ছুটি চলছিল স্কুলে। হেডস্যার একাই নেমে পরেছিলেন সাহায্য করতে। স্কুলে ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল গৃহহারা পরিবার গুলোকে। আমদের কয়েকজনকে নিয়ে স‍‍্যার একাই ঐ বৃষ্টিতে ঘুরে ঘুরে সাহায্য তুলে ওদের কয়েকদিন খাওয়া দাওয়া শুকনো জামা কাপড়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। সরকারী সাহায্য এসেছিল বেশ কিছুদিন পরে। সে বছর রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন স‍‍্যার। আজ ওনার ছেলের কৃপায় ওনার ঠিকানা হতে চলেছে বৃদ্ধাশ্রম। মনটা খচখচ করছিল।

দুবাইতে নেমে স‍‍্যার আর মাসিমাকে বসিয়ে চটপট কয়েকটা দরকারি কাজ করে নিলাম। মেল পাঠানোর ছিল কয়েকটা। এতো বড় জার্নি তে মাসিমার শরীরটা একটু খারাপ করেছিল। তিনঘণ্টা পর কলকাতার ফ্লাইটে উঠে আমার সিটটা বদলে ওনাদের কাছেই বসেছিলাম। স‍‍্যার বললেন - "একটা উপকার করবি নীল, তত্কালে আমাদের উত্তরবঙ্গে যাওয়ার টিকিট করে দিতে পারবি? ওখানেই সারা জীবন কাটিয়েছি। ওখানেই শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে চাই। তোর মাসিমারও তাই ইচ্ছা। ঐ বৃদ্ধাশ্রম কে না বলে দেবো। যে কটা টাকা পেনসিয়ান পাই তা দিয়ে আমাদের চলে যাবে। একটা এক-কামরার বাড়ি ভাড়া নিয়ে নেবো।"

এবার আমার চোখের কোন ভিজে উঠেছিল। বললাম - "আপাতত আমার উপর সব ছেড়ে দিন। ব্যবস্থা করছি।"

দমদম এয়ার পোর্টে লাগেজের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম ওনাদের নিয়ে। নেট ওয়ার্ক আসতেই কয়েকটা দরকারি ফোন করে নিলাম। বাইরে আসতেই চোখে পরল স‍‍্যারেদের নাম লেখা একটা বোর্ড হাতে বৃদ্ধাশ্রমের লোক দাঁড়িয়ে। কত আধুনিক ব্যবস্থা করেছে সুজয়দা!!

ওনাদের নিয়ে বাইরে এসে দেখলাম কাজল, অনীশ, রাহুল , তরুণ, প্রতিকদা সবাই ওয়েট করছে। সবাই ছুটে এসে স‍‍্যারের ট্রলিটা টেনে নিলো। আমি পরিচয় করালাম স‍‍্যারের সাথে ওনার সব প্রাক্তন ছাত্রদের, আজ সবাই নিজের নিজের জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত। আমার মেল পেয়ে সবাই আজ ছুটে এসেছে স‍‍্যারের জন্য। আলম ও কলকাতায় এসেছিল কোনো কাজে। কিছুক্ষণের মধ্যে ও এসে গেলো। রাহুলের ফ্ল্যাট বাগুইহাটিতে, ওখানে সবাই মিলে স‍‍্যার আর মাসিমাকে নিয়ে গেলাম। আলম জানালো সে স‍‍্যারদের নিয়ে যেতে চায়। ওদের এনজিও একটা অনাথ আশ্রম খুলেছে ওখানেই। স‍‍্যার কে ওখানেই রাখতে চায় ও। এভাবেই শ্রদ্ধাঞ্জলী দিতে চায় আমাদের হেড স‍‍্যার কে।বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের মাঝে স‍‍্যার খুব ভাল থাকবেন ওর ধারনা। যে কাজ সারা জীবন করেছেন তাই নিয়েই থাকবেন। স‍‍্যার আর মাসিমা রাজি হলেন অবশেষে। 

স‍‍্যার মাসিমাকে বললেন - "কে বলে আমার সন্তান মানুষ হয়নি। এরাও তো আমার ছেলে। আজ কেমন সবাই আমাদের আপন করে নিলো"। স‍‍্যারের চোখে আনন্দের অশ্রু।

সমাপ্ত।

ডিজিটাল যুগ - Fake Account

ডিজিটাল যুগ - Fake Account


ঘর ঝাঁট দিতে এসে কাজের মেয়ে নিচু গলায় বললো, দিদি আমার রিকোয়েস্টটা এক্সেপ্ট করেন।

আমি হতভম্ব গলায় বললাম, কিসের রিকোয়েস্ট?

-ফেসবুক। রিকোয়েস্ট পাঠাইছি।

: ও আচ্ছা! নাম কি?

-ড্যাডিস প্রিন্সেস শাপলা!

আমি নিজেকে সামলালাম।‌ এত অবাক হ‌চ্ছি কেন? কিছুদিন আগেই তো আরেক কাজের মাসি আমাকে ইমোতে ইনভাইট করেছিল। আমার ইমো নাই কিন্তু তার আছে। এত অবাক হলে চলবে না‌ এই যুগে।

আমি হাসিমুখে আইডি খুঁজে বের করে রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে রাখলাম। প্রোফাইল পিকে একটা মেয়ের রংচংয়া সেলফি। আমি প্রশ্ন করলাম, কার ছবি গো?

-আমার দিদি! ইউক্যাম পারফেক্ট দিয়ে ইডিট করেছি।

: বাহ্! খুব সুন্দর।

ইদানিং আমার বেশ সুবিধাই হচ্ছে। কাজে আসতে না পারলে শাপলা মেসেজে একটা দুঃখী স্টিকার পাঠালেই আমি বুঝে যাই। স্টিকারে একটা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, sorry!

আবার রান্নাঘরে কিছু খুঁজে না পেলেও শাপলাকে মেসেজ দিলে সাথে সাথেই রিপ্লাই পাওয়া যায়।

এছাড়াও প্রায়‌ই ফেসবুকের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সে আমার কাছে আসে।

একদিন ফোন নিয়ে এসে বললো, দিদি ! মেসেঞ্জার নাকি কালো করা যায়,একটু করে দেন। আর ফলোয়ার অপশন একটু অন করে দিবেন।

দিলাম।

একদিন এসে বলল,দিদি ! এবাউটে লিখে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি।

দিলাম।

আরেকদিন বললো,দিদি ইংরেজিতে একটা স্টাটাস লিখে দেন। আমি বাংলা বলছি,

"ফিলিং বোর! গরমের ছুটি চলছে,এখন পড়াশোনা নাই, কোনো কাজকর্ম‌ও নাই। সময় কাটে না!"

দিদি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন? এইটা লেখেন ইংরেজিতে।

আমি লিখে দিলাম।

আরেকদিন আমার কাছে এসে বললো,দিদি ! রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে দেন।

আমি অবাক হয়ে বললাম,প্রেম করছো নাকি?

সে লাজুক গলায় বললো, হ্যাঁ দিদি ! রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে দেন। ছেলের নাম স্বপন সাগর!

আমি রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে দিলাম। ছেলের প্রোফাইল দেখে বড় ধরনের ধাক্কা খেলাম। ছেলে ঢাকা মেডিকেলে পড়ে।

আমি শাপলার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললাম, কোথায় পেয়েছো এই ছেলেকে?

সে হাসিমুখে বললো, ফেসবুকে !

:ও আচ্ছা!!!

পৃথিবীটা দিন দিন মনুষ্যবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে এই জাতীয় চিন্তা করতে করতে ব‌ইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিলাম। বড় দি এসে ব‌ইয়ের পাতার মধ্যে একটা ছেলের ছবি রেখে দিলেন। সেদিকে না তাকিয়ে আমি চমকে উঠে দিদিকে জড়িয়ে ধরলাম। বহুদিন পর দিদি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে।

দিদি নির্লিপ্ত গলায় বললেন, ছেলেটাকে দেখ। পছন্দ হলে হলো, না হলেও না হলো। এরসাথে তোর বিয়ে‌।

আমি হাসিমুখে তাকালাম। যার সাথেই আমার বিয়ে হোক আমার কোনো আপত্তি নাই, পছন্দের কেউ নাই আগেই বলেছি।

দিদির মুখ গম্ভীর। এর কারণ আছে। মাসখানেক আগে দিদির বড় জায়ের সাথে খুব ঝগড়া হয়েছে। দিদি তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যে তার বোনের আগে দিদি আমার বিয়ে দেবে। দুজনের বয়স‌ অনেকটা এক‌ই।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ছেলের ছবি দেখে আঁতকে উঠলাম। ছেলেটা কে সেটাতো বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই মেডিকেলে পড়া ছেলে। কিন্তু এর নাম স্বপন সাগর না, অয়ন চৌধুরী।

আমি কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে বললাম,দিদি ! এই ছেলেকে ক‌োথায় পেয়েছো? এরতো চরিত্র খারাপ। আমাদের কাজের মেয়ে শাপলার সাথে ফষ্টিনষ্টি চলে।

দিদি প্রচন্ড ‌অবাক হয়ে সবটা শুনলেন।‌তারপর রেগে আগুন হয়ে গেলেন। তারপর হতাশায় ডুবে গেলেন।

এতগুলো অনুভূতির মিশ্রণ ঘটার প্রধান কারণ সেই ছেলে আজ সন্ধ্যায় পরিবার নিয়ে আমাদের বাড়ি আসছে।

দিদি রেগেমেগে বললেন, ঝাঁটা রেডি রাখ। ঐ চরিত্রহীন ছেলের পরিবারের দম্ভ যদি আমি ধূলায় না মিশিয়ে দিয়েছি আমার নাম........

সন্ধ্যার সময় ছেলে তার পরিবার নিয়ে আমাদের বাড়িতে এলো। তাদের জন্য কোনোপ্রকার খাবার আয়োজন রাখা হয়নি। বরং আমাদের মুখ গম্ভীর। আচ্ছা করে অপমান করা হবে আজ এদের।

কাজের মেয়ে শাপলাও ছেলে দেখে চমকে তাকিয়েছে, তারপর দৌড় দিয়ে পালাতে গিয়েছিল দিদি ওর হাত ধরে আটকে ফেলেছে।

ছেলের মা আমার দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন, কেমন আছো মা?

দিদি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে শাপলাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন,একে চেনো?

শাপলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ছেলে অবাক হয়ে বললো,না তো!

-নাটক করো? তোমার নাটক আমি বের করছি। আমার বোনের জীবন‌ নষ্ট করতে আসা?

দিদি ল্যাপটপে ফেসবুক ওপেন করে শাপলার সাথে তার রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেখালো।

ছেলেটা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থেকে ফোন দিয়ে তাদের ড্রাইভারকে ডাক দিলো।

ড্রাইভার ওপরে এসে শাপলাকে দেখে বড় ধরনের ধাক্কা খেলো। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে র‌ইলো।

ছেলেটা এতক্ষনে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললো, তুই বলেছিলি দাদা নতুন ফোন কিনেছি আপনার একটা ছবি রেখে দিই।

এইজন্য নিয়েছিলি আমার ছবি? আমার ছবি আর বায়ো ব্যবহার করে ফেসবুকে আইডি খুলে প্রেম করার জন্য????
😂😂😀😀

মাতৃ দিবস - একটা অসাধারন গল্প

স্বার্থ লুকিয়ে থাকে সকল সম্পর্কের মধ্যে মাতৃ দিবস

-হ্যাঁ রে, দিনে কত টাকা দেয় তোর মালিক? 
- পাঁচশো টাকা মা।
- এ-ত। তা ক'টা সিঙাড়া গড়িস?
- হাজার দুয়েক। জানো মা, আমি না আজকাল টিভির দিকে তাকিয়েও সিঙাড়া গড়তে পারি।
-তাই নাকি?
-হ্যাঁ গো মা। এই দু' বছরে অভ্যেস হয়ে গেছে।

তেরো বছরের কানুর এ এক বড় গর্ব। মায়ের কোলের কাছে ঘেঁষে স্বপ্ন দেখে, অভাবী সংসারের হাত থেকে সে বাঁচাবে তার মাকে। বড় করবে ভাইদের। নিজের একটা সিঙাড়ার দোকান হবে....

-তা বাড়িতে যখন এসেছিস ভাইবোনদের জন্য একদিন বানা না। দেখি আমার বড় ছেলের হাতের সিঙাড়া কেমন? তোর বাবাও খুব খুশি হবেন।
আনন্দে চকচক করে কানুর চোখ। বাবা খুশি হবে? বেশ কালই হবে। খুব ভাল করে বানাব মা।
কানুর বাবা চোখে বিশেষ দ্যাখেন না। কারখানার আগুন ছিটকে চোখে লেগে সেই যে দু বছর আগে শয্যা নিয়েছেন, আজও সেভাবেই পড়ে। একটা চোখ যাওয়ার পর থেকে মনটাও খান খান হয়ে গেছে। সেই বাবা...
-মা, ময়দা-টয়দা আমিই কিনে আনব। তুমি শুধু আলু-টালুগুলো কেটে দিও।
-ঠিক আছে।
-মা, একটু নারকোল কোরা দেব? বেশ লাগবে খেতে।
-না। না। নারকোলের অনেক দাম। দরকার নেই।
সিঙাড়া, তার আনুষঙ্গিক...দোকানের গল্প, মালিকের গল্প... মায়ের পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে কানু। মায়ের কাপড়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ। অনেকবার ভেবেছে মার একটা না-কাচা কাপড় সে নিয়ে যাবে দোকানে।

বড়বাজার অঞ্চলের দোকানঘরের মধ্যে থাকতে থাকতে এমন অভ্যেস হয়ে গেছে, ভোর চারটেতে ঘুম ভেঙে যাবেই যাবে। কী আশ্চর্য সেই চারটেতেই উঠে পড়ে কানু! কী করবে। সবাই ঘুমোচ্ছে। পা টিপে টিপে বেরোয়। উঠোনে এসে আকাশের দিকে তাকায়। মেঘলা। বৃষ্টি হবে বোধহয়। 
নাহ্। উনুনটা ধরিয়ে রাখি। মা খুব খুশি হবে। কয়লা-কাঠ জড়ো করে উনুন ধরায় কানু। আস্তে আস্তে উনুনে আঁচ ওঠে। কানু তাতে ভাতের জল চাপায় হাঁড়িতে। ইস্ টাকা জমিয়ে যদি মাকে একটা গ্যাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
-তুই ওখানে কী করছিস কানু? ও মা! উনুন ধরিয়ে ফেললি? সোনা ছেলে রে আমার! 
তার পর চেঁচিয়ে অন্য ভাইদের উদ্দেশে বলে, হ্যাঁ রে তোরা দেখে যা ছেলে আমার কেমন উনুন ধরিয়ে দিয়েছে। তোমরা তো হাত পা নেড়েও বসো না।
মায়ের চেঁচামেচিতে জেগে উঠোনে চলে আসে বাকি চার ভাই। তার পর এত সামান্য ব্যাপার দেখে ওরা আবার ঘুমোতে চলে যায়।
-মা, বলো না কী সাহায্য করব তোমাকে?
- দু বালতি জল এনে দিবি সোনা?
এক ছুটে দুটো বালতি হাতে বেরিয়ে পড়ে কানু।
লাফাতে লাফাতে তেরো বছরের আনন্দে উচ্ছ্বল ছেলেটা জল আনতে যায়। ভাবে পুজোয় যখন আসবে তখন একটা চাকাওয়ালা ড্রাম বানিয়ে নিয়ে আসবে মালিককে বলে। মালিকরা দোকানে ওই ভাবেই জল আনায়। আর পুজোর ছুটিতে তিন দিন নয়, এ বার দশ দিন থাকবে মার কাছে। ভাইদের সঙ্গে খেলবে। কিন্তু পুজোয় কাজ করলে তো ডবল টাকা দেয়। দৃর। দরকার নেই। পুজোর সময় মা-কে ছাড়া ও থাকতে পারবে না।

ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফেরে কানু। দু' হাতে দু বালতি জল।
-আয় আয় কানু। নে, আলু আমি কেটে রেখেছি। তুই ময়দাটা নিয়ে আয়।
বালতি রেখে আবার ময়দা আনতে ছোটে কানু। কী আনন্দ! আজ সবাইকে প্রাণ ভরে খাওয়াবে সে।
বাড়ি ফিরে বড় গামলায় ময়দা মাখতে বসে। একে একে ভাইরা এসে কানুর এই কাজ দেখে যায়। 
-তোমাদের দ্বারা কিস্যু হবে না। যাও পড়তে বসো। দ্যাখো যদি পাস করতে পারো। অন্য ভাইদের মুখ ঝামটা দেয় মা। 
কানু মনে মনে এত খুশি হয়! মা তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসে। তার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি 'আপন' হয়। তার ওপরেই সবচেয়ে ভরসা। চোখে জল আসে কানুর। এ বার মাত্র দুদিন ছুটি নিয়ে এসেছে। পুজোয় দশ দিন নেবেই সে।
-হ্যাঁ রে বেলা যে বয়ে যায়। তোদের হল?
-এই আর একটু বাবা। তাড়াতাড়ি করে বাকিগুলোও গড়ে নেয় সে। তার পর উনুনে কড়াই বসায়। তেল ঢালে। 
-মা। এ বার তুমি এ গুলো ভেজে দাও। আমি ভাজতে পারি না। জানো ভাজতে পারলে আরও আট আনা করে বেশি পেতাম। কিন্তু মালিক আমাকে ভাজতে দেয় না। বলে ছোট ছেলে হাত পুড়ে যাবে।
-দূর। কেন পারবি না। আমার কোলে বোস, আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।
-না মা, আমার ভয় করে। থাক।
-দূর পাগল। ভয় কী রে। আয় না। আমি শেখাচ্ছি।
প্রায় জোর করেই শিখিয়ে দেয় গরম তেলে কী করে ছাড়বে। ছেঁকে তুলবে। "আট আনা ছাড়বি কেন!"
মা কানুর গলা জড়িয়ে বলে এই ছেলেটাই আমাকে ভালবাসে। কানু মায়ের বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে। 
-মা এ বার পুজোয় তোমার কাছে দশ দিন এসে থাকব জানো। আবেশে বুজে আসে কানুর চোখ। 
-সে কী রে, তুই যে বললি পুজোর সময় ডবল মাইনে?
-মা।
-বোকা ছেলে। কেউ এ সুযোগ হারায়। তুই দশমীর দিন আয়।
-ও দিন তো মায়ের ভাসান।
-তাতে কী।
-মা।
-সোনা। তুই তো ভাইদের মতো অবুঝ নয়। তোর ওপরেই তো জোর করতে পারি বল। পুজোয় আসিস না বাবা। ওই টাকাটায় ভাইদের পরীক্ষার ফিজ জমা করতে হবে।
এতক্ষণে মায়ের বুকের মধ্যে থেকে মাথা তোলে কানু। যার ভাল নাম কর্ণ। এ যুগের কর্ণও বলা যায়। 
তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে আবেশ।
-বোকা ছেলে। কাঁদছিস কেন। দশমীর দিন আসবি। খুব গল্প করব দুজনে।
-তাই হবে মা। ভাইদের সঙ্গে আমার কোনও দিনই আর খেলা হবে না।
চোখের জল মুছে মা-ও দ্রুত বাড়ির ভিতরে চলে যায়। দূরের ঘর থেকে ভেসে আসে খরখরে এক স্বর। 
-কী রে কর্ণ, ও কানু তোদের হল? আমার তো খিদেতে পেট জ্বলে যাচ্ছে।

 -Somdutta Chakraborty

বিসর্জন

বিসর্জন - Bengali Story - Bangla Golpo

Bosorjon

জলের ধারে বসে থাকতে থাকতে বিজয়ার অনেককালের কথা মনে পড়ছে আজ। 
কোথাকার এই নদী,কোথাকার এই জল আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে!তার জীবনও তাই!
"দোল দোল দুলুনি" ছড়ার বয়সে সে সিঁথি রাঙা করে এ বাড়িতে এসেছিল। পাঁচ বছরের মেয়ে বিয়ের কী বোঝে? 
তবে সাজতে ভারী ভালো বাসত বিজয়া। 
ওইটুকু বয়সেই নাকে নথ পড়তো টেনে, কানে ঝোলা দুল, শ্বশুরবাড়ির মেয়ে-ঝিরা তো কচি মেয়ের সাজের বহর দেখে হেসে খুন হত। 
তার কিশোর বর একবার নথ ধরে নাড়া দিয়েছিল বলে বিজয়া সাত সাতটে দিন মান করেছিল। 
শেষে একজোড়া পায়ের মল গড়িয়ে দিয়ে তার মান ভাঙানো গেল।

বর বলতে কতটুকু মনে পড়ে বিজয়ার? 
সেই এক কিশোর ছেলে, এই এত্তো বড়ো বাড়িতে সেই ছিল তার খেলার সাথী। 
অথচ খেলা কত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল তাদের। 
বিয়ের একবছর পর বিজয়ার স্বামী কিশোর ব্রজমোহন জমিদারির কাজে গিয়েছিল বায়রের গ্রামে। 
নদী পেরোনোর সময় নৌকাডুবিতে মারা যায় সে। 
ছয় বছরের বয়সে বৈধব্য এসে গ্রাস করল বিজয়ার সমস্ত সজ্জা,সুখ আনন্দের সামগ্রী। সেও প্রায় বারো তেরো বছর আগের কথা।

এতদিনে গায়ের চামড়ার সাথে এক হয়ে গেছে সাদা থানখানি। 
তবুও দুর্দান্ত অষ্টাদশী যৌবন শরীরের সমস্ত বেড়া ভেঙে বেড়িয়ে আসতে চাইছে যেন। 
বিজয়ার গায়ের রঙ শ্যামলা, বৈধব্যের কৃচ্ছসাধনে কিঞ্চিৎ কৃশ। 
বড়ো বাড়ির বিধবা বিজয়ার দিন কাটে গোয়াল ঘর পরিষ্কারে, ঠাকুরঘরের জোগাড়ে। 
যৌবনের দরজায় দাঁড়িয়ে একটা ফুল ক্রমশ যেন শুকিয়ে উঠছে। 
কেউ খোঁজ রাখছে না সে ফুলের, কেউ বলছে না একবারও -'জল খাবে ফুল, জল?'

এবছর শ্রাবনে বাড়ির ছোট ছেলের বিয়ে হয়েছে। 
নতুন বউ কিশোরী, কিন্তু সুন্দরী। 
অল্পদিনেই সে স্বামী ও নতুন সংসারের মনের মধ্যিখানে জায়গা করে নিয়েছে। আশ্বিনের মাঝামাঝি দুর্গাপুজো। 
উৎসবের আনন্দে বড়োবাড়ি আত্মহারা হয়ে উঠেছে। 
বাড়ির বউরা গা ভরা গয়না পরে ঠাকুর দালানে বসে আলতা পায়ে দিচ্ছে, সে দৃশ্য এ বাড়িতে চেনা। 
অথচ বিজয়ার ভারী অসহ্য লাগছে এবার। 
এতোবছর বৈধব্য নিয়ে এ বাড়ির পুজো দেখছে। 
কিন্তু এবছর নতুন বউ আসায় সব যেন কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে। নতুন বউ স্বভাবতই সৌন্দর্যে অহংকারী, তার ওপরে স্বামী সোহাগিনী। সে আসা অবধি বিজয়াকে হীন চোখেই দেখেছে। 
যদিও এবাড়িতে কেই বা তাকে হীন চোখে দেখে না।তবু এ দৃষ্টি যেন বড়ো আঘাতের। 
কোথায় গিয়ে যেন বিজয়াকে মনে করিয়ে দিচ্ছে- "তুই বড়ো অভাগী।তোর স্বামী নেই,সুখ নেই, সোহাগ নেই। 
অথচ ওই পুচকে ছোট বউ কেমন স্বামীর বুকে রাঙাকনে হয়ে তোর সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। 
ধিক তোর আঠেরো বছরের যৌবন, ধিক তোর কৃচ্ছ্রসাধন বেঁচে থাকায়।"

বিজয়ার মনে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে তীব্র আত্মধিক্কার - "ধিক তোর আঠেরো বছরের যৌবন, ধিক তোর কৃচ্ছ্রসাধন বেঁচে থাকায়।"

দশমীর সকালে বাড়ির মেয়ে বউরা ঠাকুরদালানে উঠে মাকে বরণ করল। 
উৎসবের শেষলগ্নে সিঁদুরখেলায় মেতে উঠল সারা বাড়ি। 
বিজয়া ঠাকুরদালানে যায়নি, শুভকাজে বিধবাদের থাকতে নেই,তায় আবার সিঁদুরখেলা। 
দুয়েকবার দালানের ওপর থেকে দেখেছিল রাঙা হয়ে যাওয়া সারা বাড়ি,সিঁদুররাঙা বউদের রাঙা মুখগুলো।

বিজয়া তখন গোয়ালের দিকে। সে দিকটা তখন নিরিবিলি, কেউ নেই। হঠাৎ বিজয়ার মনে হল গোয়ালঘরের পেছনে কারা যেন এসেছে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে দেখল সেখানে নতুন বউ, সাথ তার স্বামী বাড়ির ছোটছেলে। 
বিজয়া একবার ভাবল চলে যাবে, অথচ পা যেন সেখানেই গাছের মতো শিকড় এঁটে বসল। 
ছোটছেলে নতুন বউয়ের সিঁথিতে একমুঠো সিঁদুর মাখিয়ে দিল। নতুন বউয়ের তখন লজ্জাবনত মুখ। 
আড়ালে বিজয়ার সর্বাঙ্গ তখন কোন এক অদ্ভুত আগুনে ক্রমশ পুড়ে যেতে লাগল। 
যে সুধাস্বাদ কোনদিন পায়নি সে, সেই সুধার ভাণ্ড চোখের সামনে নির্লজ্জ নগ্নতায় এসে দাঁড়াল হঠাৎ।দুটো মানুষ ধীরে ধীরে নিবিড় হল নিরিবিলি কোণায়, তারা জানে না তৃতীয় ব্যক্তি ক্ষুধার্ত চোখ দিয়ে গ্রহণ করছে সে দৃশ্য।

বিজয়া আর পারল না। তার মনের গভীর থেকে সেই পুরাতন ধিক্কার ধ্বনি ঘুরপাক খেয়ে উঠতে লাগল -"ধিক তোর আঠেরো বছরের যৌবন, ধিক তোর কৃচ্ছ্রসাধন বেঁচে থাকায়।"

বিজয়া এখন দাঁড়িয়ে আছে জলের সামনে। 
শরতের ভরা নদী পূর্ণযৌবনা রূপসীর মতো বয়ে চলেছে। 
বিজয়া সারা গায়ে আজ গয়না পড়েছে। 
সেকালের ভারী ওজনের বেশ কিছু গয়না আজ তার সাদাথানের ওপর উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। 
সিঁথি রাঙা হয়ে উঠছে সিঁদুরে সিঁদুরে। 
তার আজীবনের সোহাগ-সিঁদুরের সাধ মিটছে না আর। 
বিজয়ার শ্যামবর্ণ মুখ উজ্জ্বল লাল হয়ে দেখা দিল। 
গতজন্মের যাবতীয় না পাওয়া ফেলে দিয়ে বিজয়া আজ অপরূপা সেজেছে। 
সম্মুখে রূপসী নদী দুহাত বাড়িয়ে সখীর মতো ডাকছে। 
বিজয়া দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল জল, ক্রমশ নেমে যেত থাকল গভীরে....

কোথাকার এক রাজ্যে চলে যাচ্ছে বিজয়া। 
সেখানে পরিতাপ নেই,আত্মধিক্কার নেই, নিত্যদিনের বেঁচে থাকার নামে একটু একটু করে মরে যাওয়া নেই। 
সে রাজ্য থেকে বিজয়া শুধু আশা করে যেতে পারে, ভবিষ্যতের বিজয়ারা গা ভরা গয়না পরে, স্বামীর সোহাগ নিয়ে বাঁচতে পারবে। কোনও দশমীর বিকেলে বিসর্জন হবে না সেই বিজয়াদের।

ভালো থাক বিজয়ারা। ভালো থাক তাদের সুখে থাকার আকাঙ্ক্ষা। #শুভ_বিজয়া।।
-Anirban Mandal

দুগ্গা তোর দাম কতো

Bengali Dura Puja Story

Bangla Durga Puja Golpo
কয়েক কোটি টাকার গয়না পড়া দূর্গা ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম। গরমে ঘেমে নেয়ে ঘন্টা তিনেক দাড়িয়ে দাড়িয়ে পায়ের দফারফা করে রাত বারোটা বেজে দশ মিনিটে যখন ভিতরে ঢুকলাম, শত শত বিনে পয়সার মোবাইল ক্যামেরায় চিত্র শিকারীদের দাপটে মা কে ভালো করে দেখার সুযোগও পেলাম না...(পেন্নাম করা তো দুরের কথা, যদিও মোবাইল ক্যামেরা হাতে আসার পর এখন আর কেউই পেন্নাম করে না, সব গুলি ছবিই বাড়িতে এনে তারপর বোধহয় একসঙ্গে পেন্নাম সেরে নেয় ) এককথায় গলা ধাক্কা না দিয়ে কতৃপক্ষ বের করে দিলো....বাইরে এসে দেখতে পেলাম আসল দুগ্গা ঠাকুর...

পথের ধারে ছেড়া ফাঁটা শাড়ি পড়ে এক মা তার কোলের (হয়ত পিতৃ পরিচয় হীন) শিশুকে আগলে নিয়ে ভিক্ষের বাটি পাশে রেখে অঘোরে ঘুমিয়ে আছে (হয়ত আধ পেটা খেয়ে)...। পেছন ফিরে চেয়ে দেখলাম কোটি টাকার দামি প্যান্ডেল টা...চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করলাম কোটি টাকার গয়না পরিহিত মাতৃ প্রতিমাটিকে .....মনে মনে প্রশ্ন করলাম .....দুগ্গা তুই কি সত্যিই অনেক দামী....?

রাত অনেক... এবার বাড়ি ফিরবো....পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছি যদি কোন ট্যাক্সি পাই...একটু দূরেই একটি অপূর্ব সুন্দরী (ঠিক যেন দূর্গা ঠাকুর) তরুনী একটি ত্রিফলা লাইটের নীচে দাঁড়িয়ে তার আরেক সঙ্গিনী কে বলছে...."আজকেও যদি একজন খদ্দেরও না পাই তাহলে আর কাল ছেলেটার ওষুধ কিনতে পারবো না রে...মা দুগ্গা কে সকাল থেকেই মনে মনে বলছি আজ অন্তত একটা খদ্দের জুটিও মা...."

এমন সময়ই একটা কালো কাঁচের গাড়ি এসে থামল তার সামনে...গাড়ি তে প্রবল স্বরে উন্মাদ নৃত্যের গান চলছে...একটি কালো কাঁচ নামিয়ে একজন অসুর বিশিষ্ট পুরুষ জিজ্ঞেস করলেন-" কিরে! রেট কত...এখন? পুজোর বাজারে ডবল দেব....চারজন আছি...আসবি নাকি?....। মেয়েটি নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে উঠে গেলো গাড়ি তে...।যাওয়ার আগে তার সঙ্গের সঙ্গিনীটিকে ফিসফিসিয়ে বলে গেল " দেখেছিস তো মা দুগ্গা আমার কথা শুনেছে...হোক না চারজন... মা দুগ্গা আছে তো....কাল ছেলেটার ওষুধের ব্যবস্থা ঠিক করে দিয়েছে ...।"

আমি আর ফেলে আসা প্যান্ডেল টার দিকে এবার তাকাইনি... কোটি টাকার গয়না পরিহিত মাতৃ প্রতিমাটিকেও আর মনে করিনি....দেখলাম কালো কাঁচের গাড়ি টা আমার দেখা দূর্গা ঠাকুরটিকে নিয়ে চলে গেল.... আসতে আসতে নজরের বাইরে যেতে যেতে অন্ধকার রাস্তায় হারিয়ে গেলো....আমি ঝাপসা চোখে তাকিয়ে কেন জানিনা নিজেই হঠাৎ করে বলে উঠলাম

- দুগ্গা তোর দাম কতো? 
-সংগৃহিত