আলো বন্ধ করলে সাদা কালো সব সমান

আজকের লেখাটি,
একটা কালো মেয়ের কথা, যাকে অনেকবার দেখতে এসেছে 
কিন্তু কেউ বিয়ে করেনি।
Kankona San
চেয়ারে বসে বইয়ের উপর মাথা রেখে কাঁদছে রিমি। 
এই নিয়ে ৭ টা ছেলে ওকে দেখে গেছে।
কিন্তু কেউ পছন্দ করেনি। 
রিমি ভাবছে ছেলেরা তাকে পছন্দই বা করবে কেন? 
সবাই সৌন্দর্যের পাগল। 
সবাই ছোটে অপ্সরীদের পেছনে। 
তার মত কালো পেত্নী মেয়ের দিকে ছেলেরা মুখ তুলে তাকাবে কেন?
নিজের উপর রিমির রাগ হয়। 
ঈশ্বর কেন তাকে কালো করে সৃষ্টি করেছেন?
এই সমাজে যে কালো হয়ে জন্মানো অপরাধ। 
তার উপর প্রতিবেশিদের কানা-ঘুষা চলছে, 'দেখ রিমিকে
এখনো বিয়ে দিতে পারল না। বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।'
রিমির মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় আত্মহত্যা করতে।
যে সমাজ তার মত কালো মেয়েদের অধিকার দিতে পারে না সেখানে বেচে থেকে লাভ কি?
আবার ভাবে ধুর আত্মহত্যা কেন করব?
আত্মহত্যা  করেলে তো সমাজের এই সব মুখোশধারি
শয়তানদের কাছে আমার পরাজয় হবে। 
রিমির চোখে মুখে যে অনেক স্বপ্ন।
না রিমি আত্মহত্যা করবে না।
সমাজে তাকে বেচে থাকতে হবে। 
এই সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হতে হবে।
রিমির ভাবনায় ছেদ পড়ে পিঠে কারো হাতের ছোয়ায়। 
ঘুরে দেখে ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। 
ওঠ রিমি, আর কত কাদবি? ভাত খেতে চল।
মেয়ের দুঃখ ভাল করেই বোঝেন তিনি। মেয়েটার গায়ের রং কালো। মেেয়টার জন্য ভীষণ কষ্ট হয়।
কোন মতে নিজের চোখের জল আড়াল করেন মেয়ের সামনে থেকে। আজ যে তিনিই এক রকম জোর করে রিমিকে ছেলে দেখিয়েছেন। বার বার প্রত্যাখাত হয়ে রিমি ঠিক করেছিল আর
কোন ছেলের সামনে যাবে না। কিন্তু যখন ওর বাবা এসে বলল চল মা ওরা বসে আছে। আমার মান সম্মানটা রাখ।ছেলেরা যদি তোকে না দেখেই ফিরে যায় তাহলে আমার আর মান-সম্মানই থাকবে না।।তখন আর রিমি বাবার অনুরোধ ফেলতে পারেনি।


চল রিমি, ভাত খেতে চল। 
তোর মা বসে আছে। 
রিমি সুবোধ বালিকার মত বাবার পেছনে পেছনে ভাত খেতে চলে যায়।
রাতে শুয়ে রিমি ভাবছে যেদিন কোন ছেলে ওর সব কিছু জেনে শুনে নিজ থেকে এসে বিয়ের প্রস্তাব দেবে সেদিনই ও বিয়ে করবে। ওর বিশ্বাস দেশে এখনও ভাল ছেলে রয়েছে।
বেশ কয়েক দিন পর ফেসবুকে রিমির নতুন একটি ছেলের
সাথে পরিচয় হয়।
চলতে থাকে তাদের দুজনের চ্যাটিং। 
রিমির কাছে ছেলেটাকে ব্যাতিক্রমি মনে হয়। 
ওর চিন্তা-ধারা, মন-মানসিকতা সম্পুর্নই ভিন্ন ধরনের। 
ছেলেটা বেশ বুদ্ধিমানও বটে। ওর নাম ইশরাক। ইন্টারনেটে কি সব
হিবিজিবি কাজ করে উপার্জন করে। উপার্জনও মন্দ না।
ইশরাককে রিমির বেশ মনে ধরেছে। 
কিন্তু ইশরাককে ওর মনের কথা বলতে সাহস পায় না।
রিমি ভাবে আমার মত মেয়েকে কি ইশরাকের মত ভাল ছেলের পাশে শোভা পায়? 
ওর পাশে শোভা পায় কোন রাজকুমারি।
ধুর এইসব আমি কি ভাবছি? 
ইশরাক হয়ত আমাকে একজন বন্ধু ভাবে। এর বেশি কিছুই না। কিন্তু ইশরাকের মাঝে মাঝে কিছু কথা রিমিকে আশান্বিত করে তোলে।
মনে মনে ভাবে ইশরাকও হয়ত আমাকে ভালবাসে। 
সে যে অন্য দশটা ছেলের মত নয়।
যদি ওর কাছে আমাকে ভাল লেগেই থাকে তাহলে বলছে না কেন ওর ভালবাসার কথা? 
আমার মনের কথা গুলি কি গাধাটা বুঝতে পারেনা? 
আমার চোখের ভাষা কি হাবাটা পড়তে পারেনা?

এইভাবে দুই মাস কেটে যায়... 

রিমি আশায় থাকে গাধাটা ওর ভাল লাগার কথা জানাবে।
আর রিমি তার ভালবাসার নায়িকা হয়ে থাকবে সারা জীবন। ইশরাকের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেবে।
কিন্তু রিমির আশায় গুড়বালি।
ইশরাকের কোন সাড়া শব্দই নেই। 
হাবাটা কেবল ওর সাথে মজা করেই যায়। 
রিমি সিদ্ধান্ত নেয় এইবার ও নিজেই ইশরাককে বলবে ওর মনের কথা।
কপালে যা আছ হবেই।
না হলে গাধাটাকে চিরতরে হারাতে হবে।
এই যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে তখন আকস্মাৎ একদিন ইশরাক ওর ভালবাসার কথা রিমিকে জানায়। 
রিমি তো আনন্দে আত্নহারা।
রিমি বলে ইশরাক তুমি জান কিনা জানিনা তোমার এই কথাটি শোনার জন্য কত কাল, কত ক্ষণ, কত মাস, কত মিনিট অপেক্ষা করেছি তা তুমি বুঝবে না।
তুমি আমার মনের ভাষা বুঝতে পারনি? 
যদি বুঝতে তাহলে আমাকে এত কষ্ট দিতেনা! 
দুঃখে সুখে সারা জীবন তোমারই পাশে থাকব। 
আমিও তোমাকে ভালবাসি। 
কথা গুলি বলতেই রিমির গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। 
তবে এই অশ্রু দুঃখের নয় সুখের।
মোবাইলটা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে রিমি।


রিমি ও ইশরাকের বিয়ে হয়েছে এক বছর হল। 
বেশ সুখেই কাটছে ওদের দাম্পত্য জীবন।
আজ ইশরাক রিমিকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে, পথে ইশরাকের অনেক পুরানো বন্ধু রিফাতের সাথে দেখা।
ইশরাক – কিরে কেমন আছিস?
রিফাত- ভাল। তোর কি খবর? 
ইশরাক – আছি কোন রকম। কোথাই থাকিস শালা আজকাল তোর দেখাই পাওয়া যায় না।
রিফাত – ব্যবসা নিয়া ব্যস্ত আছিরে। রিমিকে ইঙ্গিত করে বলল এটা কি তোর বউ নাকি? 
ইশরাক – ঠিকই ধরেছিস। বিয়া করে স্বাধীণতা হারিয়ে ফেলেছি।
রিফাত – এ এ এ তোর মত ছেলে কি করে এই রকম কালো মেয়েকে বিয়ে করেছিস? আর কি মেয়ে খুজে পাসনি?
(রিফাতের উদ্দেশ্যই ইশরাককে অপমান করা) 
রিফাতের কথা গুলি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রিমির মনটা বিষাদে ছেয়ে যায়। নিজেকে অপরাধি মনে হয়। চোখের সামনে নিজের বউয়ের এই অপমান !! ইশরাকও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।
ইশরাক – শোন রিফাত তুই তো বিয়ে করেছিস নিশুকে। নিশু তো আমাদের ক্লাসমেট ছিল। ওকে তো আমি ভাল করেই চিনি। ওর গায়ের রংটা ছাড়া আর কি আছে বল? 
ও তো ভাল করে নিজের নামটাও লিখতে পারে না। 
কি করবি ওর ফরসা চামড়া দিয়ে। 
ওর রুপ কি বাজারে কেজি হিসেবে বিক্রি করবি? 
ওর ফরসা চামড়া কি তোর কোন কাজে আসবে? 
উপরের চামড়াটাই মানুষের আসল রুপ না। 
বাতি নিভালে কালো-সাদার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। 
চিন্তা করে দেখতো তোর একটা বিএ পাশ ছেলের সাথে ওর মত
একটা প্রায় মুর্খ মেয়েকে কেমন বেমানন দেখায় না?
ভুলে গেছিস ও এস.এস.সি তে টেষ্ট পরীক্ষায় ৮ বিষয়ে জোড়া চশমা পেয়েছিল?
তোর বউয়ের মত সুন্দরী মেয়ে যাদের মাথা আস্ত একটা ফাকা লাউ দিয়ে ভরা তাদের কেন আমি বিয়ে করব।
মাথায় গোবর ভরা সুন্দরীরা কোন উপকারে আসবে? 
আমার রিমি কালো হতে পারে কিন্তু ওর যা মেধা, বুদ্ধিমত্তা আছে তার শত ভাগের এক ভাগও নেই তোর নিশুর মাঝে। 
গোড়ান ফুল তো দেখেছিস।
দেখতে কত সুন্দর। কিন্তু মানুষের কাছে তার কোন কদর নেই। কারন এই ফুলের কোণ গুন নেই। 
তোর বউয়ের মত আলু মার্কা সুন্দরীরাও আমার কাছে এই গোড়ান
ফুলের মতই কোন মুল্য নেই। 
আমি কেন সুধুসুধু একটা লাউয়ের ঢোল নিয়ে ঘুরব? 
মাথা মোটা এইসব সুন্দরীদের আমি লেবেন্ডিস লেডি বলেই ডাকি।মনে রাখিস অমূল্য জিনিষ বাজার থেকে চিনিয়া লইতে হয়। 
তা তোর মত টিনের চশমা পড়া লোকদের চোখে ধরা পড়বে না। দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতে হবে।
পাল্টাতে হবে মন মানসিকতা। 
তবেই দেখবি সব কিছু সুন্দর লাগছে।
কথাগুলি বলেই রিফাতকে কনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ইশরাক রিমিকে নিয়ে হন হন করে হেটে যায়।
ইশরাক ভেবেছিল রিমির হয়ত মন খারাপ।
কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে দেখে রিমি মিটিমিট হাসছে।
আজ তার স্বামী তাকে অপমান করার বদলা ফিরিয়ে দিতে পেরেছে।
আজ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ মনে হচ্ছে রিমির।
মনে মনে ভাবে সমাজে ইশরাকের মত মানুষ আছে বলেই আজও সমাজ টিকে আছে।

লেখাঃ মাসুদ সরকার রানা

2 comments: